সূর্য নক্ষত্র নারী – ৩

__জীবনানন্দ দাশ তুমি আছো জেনে আমি অন্ধকার ভালো ভেবে যে-অতীত আরযেই শীত ক্লান্তিহীন কাটায়েছিলাম;তাই শুধু কাটায়েছি।কাটায়ে জানেছি এই-ই শূন্যে, তবু হৃদয়ের কাছে ছিল অন্য-কোন নাম।অন্তহীন অপেক্ষার চেয়ে তবে ভালোদ্বীপাতীত লক্ষ্যে অবিরাম চ’লে যাওয়া শোককে স্বীকার ক’রে অবশেষে তবেনিমেষের শরীরের উজ্জলতায়-অনন্তের…

সূর্য নক্ষত্র নারী – ২

__জীবনানন্দ দাশ চারিদিকে সৃজনের অন্ধকার র’য়ে গেছে, নারী,অবতীর্ণ শরীরের অনুভূতি ছাড়া আরো ভালোকোথাও দ্বিতীয় সূর্য নেই, যা জ্বালালেতোমার শরীর সব অলোকিত ক’রে দিয়ে স্পষ্ট ক’রে দেবে কোনো কালেশরীর যা র’য়ে গেছে।এই সব ঐশী কাল ভেঙে ফেলে দিয়ে নতুন সময় গ’ড়ে…

সূর্য নক্ষত্র নারী – ১

__জীবনানন্দ দাশ তোমার নিকট থেকে সর্বদাই বিদায়ের কথা ছিলোসব চেয়ে আগে; জানি আমি।সে-দিনও তোমার সাথে মুখ-চেনা হয় নাই।তুমি যে এ-পৃথিবীতে র’য়ে গেছো।আমাকে বলেনি কেউ। কোথাও জলকে ঘিরে পৃথিবীর অফুরান জলর’য়ে গেছে;-যে যার নিজের কাজে আছে, এই অনুভবে চ’লেশিয়রে নিয়ত স্ফীত…

সময়-সেতু-পথে

__জীবনানন্দ দাশ ভোরের বেলার মাঠ প্রান্তর নীলকন্ঠ পাখিদুপুরবেলার আকাশে নীল পাহাড় নীলিমা,সারাটি দিন মীনরৌদ্রমুখর জলের স্বর,-অনবসিত বাহির-ঘরের ঘরণীর এই সীমা। তবুও রৌদ্র সাগরে নিভে গেল; ব’লে গেলঃ ‘অনেক মানুষ ম’রে গেছে’; ‘অনেক নারীরা কিতাদের সাথে হারিয়ে গেছে?’-বলতে গেলাম আমি;উঁচু গাছের…

আমাকে একটি কথা দাও

__জীবনানন্দ দাশ আমাকে একটি কথা দাও যা আকাশের মতোসহজ মহৎ বিশাল,গভীর – সমস্ত ক্লান্ত হতাহত গৃহবলিভুকদের রক্তেমলিন ইতিহাসের অন্তর ধুয়ে চেনা হাতের মতন:আমি যাকে আবহমান কাল ভালোবেসে এসেছি সেই নারীর।সেই রাত্রির নক্ষত্রালোকিত নিবিড় বাতাসের মতো;সেই দিনের – আলোর অন্তহীন এঞ্জিন-চঞ্চল…

সে

__জীবনানন্দ দাশ আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে;বলেছিলো: ‘এ নদীর জলতোমার চোখের মত ম্লান বেতফল:সব ক্লান্তি রক্তের থেকেস্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি;এই নদী তুমি।’ ‘এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?’মাছরাঙাদের বললাম;গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম।আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;জলের অপার সিঁড়ি বেয়েকোথায় যে চলে গেছে মেয়ে। সময়ের…

তোমায় আমি

– জীবনানন্দ দাশ তোমায় আমি দেখেছিলাম ব’লেতুমি আমার পদ্মপাতা হলে;শিশির কণার মতন শূন্যে ঘুরেশুনেছিলাম পদ্মপত্র আছে অনেক দূরেখুঁজে খুঁজে পেলাম তাকে শেষে। নদী সাগর কোথায় চলে ব’য়েপদ্মপাতায় জলের বিন্দু হ’য়েজানি না কিছু-দেখি না কিছু আরএতদিনে মিল হয়েছে তোমার আমারপদ্মপাতার বুকের…

একটি নক্ষত্র আসে

__জীবনানন্দ দাশ একটি নক্ষত্র আসে; তারপর একা পায়ে চ’লেঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারাভরা রাতেসে আসবে মনে হয়; – আমার দুয়ার অন্ধকারেকখন খুলেছে তার সপ্রতিভ হাতে!হঠাৎ কখন সন্ধ্যা মেয়েটির হাতের আঘাতেসকল সমুদ্র সূর্য সত্বর তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাত্রি হতে পারেসে এসে…

অন্য প্রেমিককে

__জীবনানন্দ দাশ মাছরাঙা চ’লে গেছে — আজ নয় কবেকার কথা;তারপর বারবার ফিরে এসে দৃশ্যে উজ্জল।দিতে চেয়ে মানুষের অবহেলা উপেক্ষায় হ’য়ে গেছে ক্ষয়;বেদনা পেয়েছে তবু মানুষের নিজেরও হৃদয়প্রকৃতির অনির্বচনীয় সব চিহ্ন থেকে দু’ চোখ ফিরিয়ে;বুদ্ধি আর লালসার সাধনাকে সব চেয়ে বড়…

অন্য এক প্রেমিককে

__জীবনানন্দ দাশ মাথার উপর দিয়ে কার্তিকের মেঘ ভেসে যায়;দুই পা স্নিগ্ধ করে প্রান্তরের ঘাস;উঁচু-উঁচু গাছের অস্পষ্ট কথা কী যেন অন্তিম সূত্র নিয়ে,বাকিটুকু অবিরল গাছের বাতাস। চিলের ডানার থেকে ঠিকরিয়ে রোদচুমোর মতন চুপে মানুষের চোখে এসে পড়ে;শত টুকরোর মতো ভেঙে সূর্য…

স্বপ্ন

__জীবনানন্দ দাশ পান্ডুলিপি কাছে রেখে ধূসর দীপের কাছে আমি নিস্তব্ধ ছিলাম বসে; শিশির পড়িতেছিল ধীরে ধীরে খশে; নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি উড়ে গেল কুয়াশায়, –কুয়াশার থেকে দূর –কুয়াশার আরো। তাহারি পাখার হাওয়া প্রদীপ নিভায়ে গেলো বুঝি? অন্ধকার…

স্থবির যৌবন

__জীবনানন্দ দাশ তারপর একদিন উজ্জ্বল মৃত্যুর দূত এসেকহিবে: তোমারে চাই-তোমারেই, নারী;এই সব সোনা রুপা মসলিন যুবাদের ছাড়িচলে যেতে হবে দূর আবিষ্কারে ভেসে।বলিলাম; শুনিল সে: তুমি তবু মৃত্যুর দূর নও-তুমি-’নগর-বন্দরে ঢের খুঁজিয়াছি আমি;তারপর তোমার এ জানালায় থামিধোঁয়া সব; তুমি যেন মরীচিকা-আমি…

ফিরে এসো

__জীবনানন্দ দাশ ফিরে এসো সমুদ্রের ধারে,ফিরে এসো প্রান্তরের পথে;যেইখানে ট্রেন এসে থামেআম নিম ঝাউয়ের জগতেফিরে এসো; একদিন নীল ডিম করেছ বুনন;আজও্তারা শিশিরে নীরব;পাখির ঝর্না হয়ে কবেআমারে করিবে অনুভব।

ইহাদেরই কানে

__জীবনানন্দ দাশ একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে –একবার বেদনার পানেঅনেক কবিতা লিখে চলে গেলযুবকের দল;পৃথিবীর পথে পথে সুন্দরীরা মুর্খসসম্মানেশুনিল আধেক কথা – এই সব বধিরনিশ্চলসোনার পিত্তল মূর্তি: তবু, আহা,ইহাদেরই কানেঅনেক ঐশ্বর্য ঢেলে চলে গেলযুবকের দল:একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে –একবার বেদনার পানে।

আদিম দেবতারা

__জীবনানন্দ দাশ আগুন বাতাস জল: আদিম দেবতারা তাদের সর্পিল পারিহাসেতোমাকে দিল রূপ-কী ভয়াবহ নির্জণ রূপ তোমাকে দিল তারা ;তোমার সংস্পর্শের মানুষের রক্তে দিল মাছির মতো কামনা।আগুন বাতাস জল: আদিম দেবাতারা তাদের বঙ্কিম পরিহাসেআমাকে দিল লিপি রচনা করবার আবেগ:যেন আমিও আগুন…

আট বছর আগে একদিন

– জীবনানন্দ দাশ শোনা গেল লাশকাটা ঘরেনিয়ে গেছে তারে;কাল রাতে ফাল্গুনের রাতের আধারেযখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাদমরিবার হল তার সাধ।বধু শুয়ে ছিল পাশে-শিশুটিও ছিল;প্রেম ছিল, আশা ছিল জোছনায় তবু সে দেখিলকোন্ ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?অথবা হয় নি ঘুম…

নকশী কাঁথার মাঠ – ১৪

__জসীম উদ্‌দীন চৌদ্দ বাতাসের পায়ে বাজেনা আজিকে ঝল মল মল গান,মাঠের ধূলায় পাক খেয়ে পড়ে কত যেন হয় ম্লান!সোনার সীতারে হরেছে রাবণ, পল্লীর পথ পরে,মুঠি মুঠি ধানে গহনা তাহার পড়িয়াছে বুঝি ঝরে!মাঠে মাঠে কাঁদে কলমীর লতা, কাঁদে মটরের ফুল,এই একা…

নকশী কাঁথার মাঠ – ১৩

__জসীম উদ্‌দীন তেরো বিদ্যাশেতে রইলা মোর বন্ধুরে | বিধি যদি দিত পাখা, উইড়া যাইয়া দিতাম দেখা ; আমি উইড়া পড়তাম সোনা বন্ধুর দেশেরে | আমরা ত অবলা নারী, তরুতলে বাসা বান্ধিরে ; আমার বদন চুয়ায়া পড়ে ঘামরে | বন্ধুর বাড়ী…

নকশী কাঁথার মাঠ – ১২

__জসীম উদ্‌দীন বাররাইত তুই যা রে পোহাইয়ে |বেলা গে ল সন্ধ্যা হৈল—ও হৈলরে! গৃহে জ্বালাও বাতি,না জানি অবলার বন্ধু আসবেন কত রাতিরে!রাইত তুই—যা পোহাইয়েরাইত না এক পরের হৈল, ও হৈলরে! তারায় জ্বলে বাতি ;রান্ধিয়া বাড়িয়া অন্ন জাগ্ ব কত রাতিরে…

নকশী কাঁথার মাঠ – ১১

__জসীম উদ্‌দীন এগার সাজ সাজ বলিয়ারে শহরে পৈল সাড়া,সাত হাজার বাজে ঢোল চৌদ্দ হাজার কাড়া |প্রথমে সাজিল মর্দ আহ্লাদি ডগরি,পাঁচ কাঠে ভুঁই জুইড়া বসে মর্দ এয়সা ভারি |তারপরে সাজিল মর্দ তুরক আমানি,সমুদ্দুরে নামলে তার হৈল আঁটুপানি |তারপরে সাজিল মর্দ নামে…

নকশী কাঁথার মাঠ – ১০

__জসীম উদ্‌দীন দশ বড় ঘর বান্দাছাও মোনাভাই বড় করছাও আশারজনী প্রভাতের কালে পঙ্খী ছাড়বে বাসা |. — মুর্শীদা গান নতুন চাষা ও নতুন চাষাণী পাতিল নতুন ঘর,বাবুই পাখিরা নীড় বাঁধে যথা তালের গাছের পর |মাঠের কাজেতে ব্যস্ত রূপাই, নয়া বউ…

নকশী কাঁথার মাঠ – ০৯

__জসীম উদ্‌দীন নয় মত্স চেনে গহিন গম্ভ পঙ্খী চেনে ডাল ;মায় সে জানে বিটার দরদ যার কলিজার শ্যাল!নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ ;জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত |. — গাজীর গান আষাঢ় মাসে রূপীর মায়ে মরল বিকার…

নকশী কাঁথার মাঠ – ০৮

__জসীম উদ্‌দীন আট “কি কর দুল্যাপের মালো ; বিভাবনায় বসিয়া,আসত্যাছে বেটির দামান ফুল পাগড়ি উড়ায়া নারে |”“আসুক আসুক বেটির দামান কিছু চিন্তা নাইরে,আমার দরজায় বিছায়া থুইছি কামরাঙা পাটি মারে |সেই ঘরেতে নাগায়া খুইছি মোমের সস্র বাতি,বাইর বাড়ি বান্দিয়া থুইছি গজমতি…

নকশী কাঁথার মাঠ – ০৭

__জসীম উদ্‌দীন সাত “ঘটক চলিল চলিল সূর্য সিংহের বাড়িরে” |— আসমান সিংহের গান রূপার মায়ের রুঠা কথায় উঠল বুড়ীর কাশ,একটু দিলে তামাক পাতা, নিলেন বুড়ী শ্বাস |এমন সময় ওই গাঁ হতে আসল খেঁদির মাতা,টুনির ফুপু আসল হাতে ডলতে তামাক পাতা…

নকশী কাঁথার মাঠ – ০৬

__জসীম উদ্‌দীন ছয় ও তুই ঘরে রইতে দিলি না আমারে |. — রাখালী গান ঘরেতে রূপার মন টেকে না যে, তরলা বাঁশীর পারা,কোন বাতাসেতে ভেসে যেতে চায় হইয়া আপন হারা |কে যেন তার মনের তরীরে ভাটির করুণ তানে,ভাটিয়াল সোঁতে ভাসাইয়া…

নকশী কাঁথার মাঠ – ০৫

__জসীম উদ্‌দীন পাঁচ লাজ-রক্ত হইল কন্যার পরথম যৌবন— ময়মনসিংহ গীতিকা আশ্বিনেতে ঝড় হাঁকিল, বাও ডাকিল জোরে,গ্রামভরা-ভর ছুটল ঝপট লট্ পটা সব করে |রূপার বাড়ির রুশাই-ঘরের ছুটল চালের ছানি,গোয়াল ঘরের খাম থুয়ে তার চাল যে নিল টানি |ওগাঁর বাঁশ দশটা টাকায়,…

নকশী কাঁথার মাঠ – ০৪

__জসীম উদ্‌দীন চার কানা দেয়ারে, তুই না আমার ভাই,আরও ফুটিক ডলক দে, চিনার ভাত খাই— মেঘরাজার গান চৈত্র গেল ভীষণ খরায়, বোশেখ রোদে ফাটে,এক ফোঁটা জল মেঘ চোঁয়ায়ে নামল না গাঁর বাটে |ডোলের বেছন ডোলে চাষীর, বয় না গরু হালে,লাঙল…

নকশী কাঁথার মাঠ – ০৩

__জসীম উদ্‌দীন তিন চন্দনের বিন্দু বিন্দু কাজলের ফোঁটাকালিয়া মেঘের আড়ে বিজলীর ছটা— মুর্শিদা গান ওই গাঁখানি কালো কালো, তারি হেলান দিয়ে,ঘরখানি যে দাঁড়িয়ে হাসে ছোনের ছানি নিয়ে ;সেইখানে এক চাষীর মেয়ে নামটি তাহার সোনা,সাজু বলেই ডাকে সবে, নাম নিতে যে…

নকশী কাঁথার মাঠ – ০২

__জসীম উদ্‌দীন দুই এক কালা দতের কালি যা দ্যা কলম লেখি,আর এক কালা চক্ষের মণি, যা দ্যা দৈনা দেখি,—ও কালা, ঘরে রইতে দিলি না আমারে |— মুর্শিদা গান এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল,কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের…

নকশী কাঁথার মাঠ – ০১

– জসীম উদ্‌দীন এক বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী,উইড়া যাওয়ার সাধ ছিল, পাঙ্খা দেয় নাই বিধি |— রাখালী গান এই এক গাঁও, ওই এক গাঁও — মধ্যে ধু ধু মাঠ,ধান কাউনের লিখন লিখি করছে নিতুই পাঠ |এ-গাঁও যেন…

Posts navigation