শুধু একটা শূন্য


লেখক: মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন

ছোট গল্প: শুধু একটা শূন্য
আজ আমি অভিককে দেখতে এসেছি, হাসপাতালের মর্গে। সাদা শুত্র ট্রের মাঝে অভিক শুয়ে আছে। আজ ওর মুখে সেই চিরচেনা হাসি নেই, ও ঘুমাচ্ছে। ওকে দেখে মনে হলো যেন একটা নিরেট পাথর।
সামনে শুভ্র সাদা কাপুড়ে মোড়ানে রয়েছে অভিকের নিথর দেহ। তার পাশে স্থীর হয়ে দাড়িয়ে আছে পরী, পরী অভিকের বড় মেয়ে।
আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো অভিকের জীবনের এক বাস্তব ছবি এ যেন এক জীবন চিত্র।
এই তো ২২ বছর আগে হঠাৎ রাতে নিশির প্রচুর প্রসব ব্যাথা উঠলো। অভিক দ্রুত নিশিকে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করলো। ডাক্টার দ্রুত অপারেশন করার জন্য ওটিতে নিয়ে গেলো।
জন্ম হলো পরীরঃ
হাসপাতাল খরচ সর্বসাকুল্যে ত্রিশ হাজার ! টাকা যেন কিছু নয় !জন্মানোর মূল্য নেহাৎ কম নয়!
পরী পুঁচকিটা সবে মায়ের দুধ ছেড়েছেঃ
বেবিফুডের দাম আকাশছোঁয়া! তার উপর নতুন জামা…ন্যাপি…কত কি! সবসব মিলিয়ে মাসে কমপক্ষে হাজার পাঁচেক টাকার ধাক্কা!
পরী যে সময় হাঁটতে শিখেছেঃ
হাঁটতে শিখেই বাসার সব জিনিস ভেঙেছে! ভাঙার পর তার খিঁক খিঁক হাসি যদি দেখতে! উপরের পাটির দুটো দাঁত উঠেছে! আবার যখন তখন কুটুস করে কামড়েও দেয়!
পরীর পুতুল চাইঃ
বাপরে বাপ! একটা পুতুলের দাম প্রায় এতো টাকা…! দুঘন্টা পরেই তো এটার কাম শেষ হবে! একে বলে সহজ কথায় অপচয়! কি আর করার মাসে তা প্রায় হাজার দুই টাকার অপচয়।
পরী স্কুলে ভর্তি হলোঃ
ইউনিফর্ম-বই খাতা- মাস গেলে স্কুলের বেতন -সব মিলিয়ে তা প্রায় হাজার ছয়েক তো হবেই।
পরীর টিউটর চাইঃ
ভাল রেজাল্ট করতে হলে ভাল করে পড়তে হবে। সবকটা সাবজেক্টের টিচার চাই। একেক জনের বেতন ন্যুনতম তিন হাজার টাকা ! সবকটা মিলিয়ে মাসে ষোল হাজার !
পরীর সাজের ঘটাঃ
সুন্দরীর সাজার শখ ষোল আনা। তার হাল ফ্যাশনের জামা চাই। ক্রিম লিপস্টিক,ফেসিয়াল—কত হাঙ্গামা!এই প্রোডাক্ট মাখছে,ঐ প্রোডাক্ট মাখছে!
এ জন্য মাসে গুনতে হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।
পরীর বিয়ের বয়েস হলঃ
সম্বন্ধ দেখতে দেখতে পাগল! দলে দলে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে-আর নাস্তার শ্রাদ্ধ! হাজার হাজার টাকা শুধু মিষ্টির পেছনেই গেলো!
পরীর বিয়ে হলঃ
ভাল পাত্রেই বিয়ে হয়েছে। দেখতে শুনতে ভাল।পয়সাওয়ালাও বটে।তবে ছয় ভরি সোনা, আর প্রচুর ফার্ণিচার চেয়েছে। দুশো বরযাত্রী! এসি সেন্টারে খাওয়াতে হবে, আর খাবারে থাকতে হবে আধুনিকতার ছোঁয়া -বেয়াই এর আবদার। অগত্যা!……খাবারের পিছনে আট লাখ!
বিয়ের পরে পরীর শ্বশুর বাড়ীঃ
বিয়ে দিলেই তো হল না। প্রথম প্রথম সবাইকে এটা ওটা দিয়ে ঠান্ডা রাখতে হয়। বেয়াইকে নতুন জামা কাপড়, বেয়ানকে জামদানি, জামাইকে স্যুট……!সব মিলিয়ে লাখ টাকার এক পয়সা কমেও সম্ভব নয়!
পরী কাঁদছেঃ
জামাইয়ের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না ! দশ লাখ টাকা লাগবে! ওটা কি মুখের কথা! এত টাকা…! অভিক তার সমস্ত জমানো টাকা দিয়ে দিয়েছে পরীর জীবনের সুখের জন্য।
পরীর বরের জন্য গাড়িঃ
গাড়ি কেনার জন্য আবার আট লাখ! দিতে পারা যায়! অসম্ভব! অভিক কিছুতেই দিতে পারছে না। কোথা থেকে দিবে, অভিকের তো আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
অভিকের শেষ সময়ঃ
এক পরীকে সুখে রাখতে গিয়ে অভিক নিজের প্রতি প্রচন্ড অবহেলা করেছে যার ফল আজ ও পেলো।
আসলে সংসারটা বড় মায়ার জায়গা এখানে অভিকের মতোন সাধারন বাবারা কেবল দিয়েই যায় বিনময়ে কিছুই পায় না শুধু অবহেলা ছাড়া।
অভিক নিজের চিকিৎসা না করিয়ে সব কিছু দিয়ে চেষ্টা করেছিলো সংসার টাকে বাঁচিয়ে রাখতে।
হাসপাতালের মর্গে নিথর পড়ে আছে অভিকের দেহ। অবশেষে হাসপাতালের সমস্ত বিল মিটিয়ে হাতে পেলাম অভিকের হীমশীতল নিথর দেহ। সব মিলিয়ে হাসপাতালে গেল ষাট হাজার টাকা।
অবশেষে লাশ অভিক…
বাসায় লাশ আনা হলো,চারিদিক থেকে কানে ভেসে আসছে কুরআন তেলোয়াতের শব্দ। আগরবাতি আর কর্পুরের গন্ধ চারিদকে বাতাসকে মাতোয়ারা করে তুলছে।
কাফনের কাপড়, আর শেষ সময়ের সামান্য উপকরন !—এবার খরচটা পুরোপুরি সাশ্রয়!
আমি ভাবছি, আমি সহ অভিকের তো অনেক বন্ধু অভিকের এ পরিনতীর জন্য আমরা কি এতুটুকু দায়ী নয়? আমরা কি পারতাম না শেষ সময়ে অভিকের চিকিৎসাটা করাতে কিম্বা সকলে মিলে অভিকের বোঝাটাকে একটু হালকা করতে? আসলে এটা কি ভদ্রবেশী মানুষের ভদ্র মানুষিকতার প্রকাশ না কি পুরনো সেই মানুষিকতার আধুনিক প্রকাশ? মানবিকতা কি সত্যি তাহলে আজ কেবল বই এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
অভিকের জীবনের এতদিনের সমস্ত হিসাবের যোগফল—
……শুধু একটা শূন্য!
(বিঃদ্রঃ- টাকার হিসাবটাকে অভিকের জীবনের কষ্টের রূপক হিসাবে বোঝানো হয়েছে।)

,

Post navigation

Leave a Reply

Your email address will not be published.