মেঘের খেলা (পর্ব-আট)

বন্যা হোসেন
অটোয়া, কানাডা।

উপন্যাসঃ মেঘের খেলা (পর্ব- আট)

স্কুল শুরু হওয়ার পর এক মাসের বেশী সময় পার হয়ে গেছে। সুখীও ধীরে ধীরে ভয় কাটিয়ে উঠেছে। মানুষ মূলত অভ্যাসের দাস। নিজের গন্ডীতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
কাজের ক্ষেত্রে ছোটখাট সাফল্য সুখীর মনে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। দুটি বিজ্ঞাপনে তার ক্রিয়েটিভ প্ল্যান প্রশংসিত হয়। সাদী এই অফিসে জয়েন করার পর দুটি সাফল্য। সবার মাঝে আনন্দের পরশ নিয়ে আসে।
সেদিন সুখী লাঞ্চ সেরে ফিরছিল রূম্পা আর ঈশিতার সাথে। করিডোরে দেখা হল সাদীর। তাকে দেখেই উৎফুল্লভাবে বলে,
-আমি কিন্ত প্র‍্যাক্টিস করে যাচ্ছি।
সুখীও হেসে উত্তর দিল,
-এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে প্র‍্যাক্টিস করুন! সে তার বান্ধবীদের জানায় সাদীর কালা ভুনা রান্নার কথা। তারাও আগ্রহী হলে সাদী ও তাদেরকে পালটা জবাব দেয়।
-রিস্ক নিয়ে যদি খেতে চান, আমার কি? অবশ্যই খাওয়াব। সুখী তাকে মনে করিয়ে দেয়,
– এত দেরী করছেন শিখতে, আমার তো এক্সপেকটেশন বেড়ে যাচ্ছে।
সাদী হাসতে হাসতে বলে,
– ঘটনা একই। থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। জম্পেশ ক্ষুধা পেলে সবই অমৃত লাগে!

সাদীর ঝকঝকে দাঁতে হাসির সঙ্গে দুঃখিত মুখ ভঙ্গি করে বলে,
-এখন কিন্তু রীতিমতো ভয় পাচ্ছি। কেন যে বলতে গেলাম কালা ভুনার কথা!

সুখীর হাস্যমুখ বড়ই দৃষ্টিনন্দন, মনে মনে স্বীকার করে সাদী।

কয়েকদিন পর সব ম্যানেজার লেভেলের কর্মীদের বিগ বসের বাড়ীতে আমন্ত্রণ জানানো হল। পরের সপ্তাহের শুক্রবার ডিনারে ডেকেছে স্বয়ং বিগ বস। উল্লেখ করে আছে, শুধুই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।

সুখী বুঝে গেল, এ পার্টি এড়ানো যাবে না। বসের বাড়ীতে হলেও এটা অফিসিয়াল পার্টি বলা যায়। হুম, তার মানে অর্পাকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। নাজমার বাসায় রাখা যাবে কি না জানতে হবে। ওরা প্রায়ই ব্যবসার কাজে বাইরে যায়।

পার্টির আগের রাতে সাদীর মেসেজ এল,
-খালা রাখতে পারবে না অর্পাকে?
-বাচ্চাদের ঝামেলা সহ্য করতে চায় না খালা।
-এখানে কাছেই আমার বন্ধুর বাসায় যাবে রোহান। ওকে ওখানে রাখা যাবে।
-একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। দেখছি কি করা যায়।
– কালা ভুনা আজকে আবার নষ্ট করলাম। সাদী জানাল।
-এটা কত নাম্বার ট্রাই ছিল?
-থাক, ওটা না হয় গোপনই রইল।
সুখী জোরে হেসে উঠল।
– আমি চেষ্টা করলে আপনার আগে শিখতে পারব।
-শ্রাবন্তী, চিটাগংয়ের আর কোন খাবার আপনি পছন্দ করেন?
-উমম, একটু চিন্তা করে বলি।
-জলদি, প্লিজ।
শুক্রবার অনেক ভেবে চিন্তে গাঢ় শেডের গোলাপী সূতির শাড়ী পরা ঠিক করল। সে জুয়েলারী পরার মেয়ে নয়। তবু আজ কি মনে করে হীরের একজোড়া কানের দুল পরল। খুব ছোট।এগুলো মায়ের। সে সাধারণত গলায় কিছু পরে না। আজকাল গলায় বড় বড় লেকলেস পরা ফ্যাশন এসেছে। সে কখনোই চলতি ফ্যাশনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না।

দিনের বেলা খালা গোসল করার সময় বারবার কল খুলছিল। একসময় প্যাঁচ কেটে কল আর বন্ধ হয় না। পানিতে বাথরুম ভেসে গেল। ছুটল মিস্ত্রির খোঁজে। এক ঘন্টা পর মিস্ত্রি এসে সব ঠিক করে দেয়ার পর ঠিকে কাজের লোককে নিয়ে সব গুছিয়ে রান্না শেষ করতে অনেক দেরী হয়ে গেল। রোহানের জন্য কিছুটা পাস্তা বানিয়ে নিয়েছে। সব শেষ করে অর্পাকে তৈরী করে পৌঁছাতে দেরীই হয়ে গেল। অর্পাকে নাজমার শাশুড়ীর কাছে রেখে এসেছে। মেয়ে অবশ্য বায়না ধরেছিল লোহানের বাসায় যাবে। অনেক কষ্টে বোঝানো গেছে রোহানও বাসায় নেই।

সে আড়ং থেকে একটা শো পিস নিয়ে এসেছে গিফট র‍্যাপ করে। খাবারের বক্সের উপরে উপহার রেখেছে যাতে অন্যরা না বুঝতে পারে। কে জানে, কেউ যদি ভুল বোঝে ! বসের বাসায় খাবার রান্না করে আনা তো স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে পড়ে না। কেউ ভাবতে পারে সে অতিরিক্ত অন্তরংগ হবার চেষ্টা করছে।

তাকে দেখেই শাকিল এগিয়ে এল। শাকিলের বউটা খুব মিষ্টি দেখতে…হাস্যোজ্জ্বল, সদালাপী। সুখীকে দেখেই এসে অর্পার খোঁজ নিল। শাকিল ঠাট্টা ছাড়া থাকতে পারে না,
-কি রে, তুই জানিস এটা অফিসিয়াল মিটিং! এত দেরী করলি?
-গাড়ীয়ালাদের জন্য মিটিং হতে পারে। আমার জন্য নয়। সুখীও পালটা উত্তর দেয়।
-তোর খোঁজ করছিল বস!

সাদী এগিয়ে এল। নীল জিন্স আর চেক শার্টের ঘরোয়া সাদীকে একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছে।
-খুঁজছেন কেন? ভয় পাচ্ছেন আজকে রান্না টেস্ট করব বলে?

গোলাপী শাড়ীটিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো সুখীকে অপরূপ লাগছে। প্রসাধনহীন মুখটিতে শাড়ীর গোলাপী আভা লেগে তাকে করে তুলেছে অনন্যা।
সাদী চোখ ফেরাতে পারছে না।

খুব নরম স্বরে বলল,
-হু ভয় পাচ্ছি।
সুখী উপহারের ব্যাগটি দিলে সাদী হাতে নিয়েই কাগজে মোড়ানো শোপিসটি বের করে আনে।
-রোহানের জন্য একটু পাস্তা এনেছি।
সাদী এগিয়ে যায় রান্নাঘরের দিকে। সুখী পিছনে। সাদী বক্স বের করে ফ্রিজে রেখে দেয়।
-আমি তো কোথাও কালা ভুনা দেখছি না! সুখী বিভিন্ন পাত্রে খাবারের দিকে তাকিয়ে বলে।
-ভোলেন না কিছু, তাই না!
-সাদী, রোহান কই ?
এই প্রথম তার নাম উচ্চারণ করলো সুখী। সাদীর নিজের নামের সামান্য দুটো অক্ষর কারো কন্ঠে শোনায় কোন মহার্ঘ ক্রিস্টালের মত …ভয় হচ্ছে পড়ে ভেঙ্গে না যায়!
সাদীর পা যেন মাটিতেই গেঁথে গেল।
সুখী আবার ডাকলো,‘সাদী’।
সাদী আবার ফ্রিজের দরজায় তাকিয়ে আছে যেন ওখানেই যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর লেখা আছে।
আবার ডাকলো, সাদী?
সুখী কিছূটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে,
-রোহানের কথা জানতে চাইছিলাম!
-ওহ, রোহানকে আমার বন্ধু নামিয়ে দিয়ে যাবে দশটায়।
তারা দুজনে তখনও খোলা ফ্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে। যেন কি গভীর আলোচনা চলছে মগ্ন।
-শ্রাবন্তী! বলেই তাকিয়ে দেখে নেয় সুখীকে।
-এসব পার্টির মাথামুন্ডূ আমি বুঝি না। বাচ্চাদের নিয়ে আসা যাবে না! অর্পা এমিনিতেই সারা সপ্তাহ ঘরে থাকে না। আজ একটা ছুটির দিন আজও মেয়েটা বাইরে !
-তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে?
-রোহানের সাথে দেখা না করে যাই কি করে?
-রোহান ফেরা পর্যন্ত থাকবেন আপনি?
-হুম। এখন যেন সে ফেরার জন্য অতটা উদ্গ্রীব নয়।

সময় যেন স্থির হয়েছিল দুজনের মাঝে। চোখে চোখে পড়ছে বারবার, চোখ ফিরিয়ে ফের তাকাচ্ছে।

সাদীকে কেউ ডাকতে এলে হুঁশ ফিরে পেল দুজনেই। অন্যদের সঙ্গে গল্প করে সময় বেশ তরতর করে কেটে গেল। মাঝে একবার খোঁজ নিল অর্পার।
ফোনে মেসেজ এল।
-কালা ভুনা কেমন হল?
– খারাপ না।ক্যাটারিং নিয়েছেন, নিজে তো আর করেননি।

রোহান ফিরে সুখীকে দেখেই চোখে কৌতুহলের আলো ফুটিয়ে ইতিউতি তাকায়, অর্পা কই?

-বাচ্চারা নেই তো সোনা! নিমেষেই মুখ অন্ধকার! এক লাফে নিজের ঘরে চলে গেল। সুখীও পিছু পিছু। রোহানের ঘর ভারী সুন্দর করে সাজানো।পড়ার টেবিল, বুকশেলফ, খেলার সরঞ্জাম, বিছানা বেশ পরিপাটি করে রাখা।
বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পা দোলাচ্ছে।
-রোহান! মিষ্টি ডাক শুনে রোহান মুখ ঘুরিয়ে তাকায়।
–একা একা বোরিং লাগছে?
রোহান মিষ্টি করে হাসে শুধু। টেবিল থেকে ড্রয়িং খাতা, পেন্সিল নিয়ে বিছানায় এসে বসে। রোহান ততক্ষণে উঠে বসেছে।

সুখী অনায়াসে কয়েকটি আঁচড়ে কার্টুন ফিগার এঁকে দেয়। শেখায় রোহানকে কিভাবে এদেরকে নিয়ে গল্প বানানো যায়। ভীষণ কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে আছে সে।
একজনকে দেখিয়ে বলে,”ওর নাম কি ?’’
সুখী চিন্তিত হয়ে বলে,‘’উমম, কি নাম দেয়া যায়!”
-সুপারম্যান…পাওয়ার ম্যান …।

শক্তিই ক্ষমতার উৎস…বাচ্চা ছেলেও জানে।

-মোমো নাম দিলে কেমন হয়? মফিজ মোমো?
রোহান হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। হাসিই থামে না তার।
-ওর বাবার নাম মোমো?
সুখী মাথা হেলিয়ে সায় দিলে রোহান হাসতে থাকে।
সুখী আরও কৌতুক যোগ করে মজাদার কিছু চরিত্র এঁকে ফেলে।

সাদী রোহানের জন্য আইস্ক্রিম নিয়ে এসে দুজনকে খুঁজে পায় মহাব্যস্ত। রোহান বাবাকে পেয়ে মজাদার কার্টুন বোর্ডের কাহিনী বর্ণনা করে হাসতে হাসতে। এবার সে নিজেই আগ্রহী কার্টুন কাহিনী বানাতে।
সুখী সাদীকে বলে,
-শিখিয়ে দিলাম কার্টুন ক্যারেকটার বানানো। এবার দেখবেন, আপনাকে কেমন পাগল বানিয়ে ছাড়ে।

কথা বলতে বলতে দুজনই বেরিয়ে এল রুম থেকে করিডোরে।
সাদী হাঁটা থামিয়ে বলল,
-আপনাকে ডেকে আনা-ই ভুল হয়েছে দেখছি ! ছেলেটাকে পাগল বানিয়ে আমাকেও পাগল বানানোর ইচ্ছে!
সাদী অকস্মাৎ থেমে ফের দেখে সুখীকে। বিপদজনক নৈকট্যে দাঁড়িয়ে সুখী চকিত দৃষ্টি বুলায় সাদীর মুখে।

– শ্রাবন্তী! বলতেই সুখী নিজেকে আবিষ্কার করে সাদীর বাহুবন্ধনে…ঠোঁটে সীলমোহর।

অপ্রত্যাশিত এই আবেগ সাদীর কল্পনাতেও ছিল না কিছুক্ষণ আগে। শীলা ছাড়া কারো সাথে সম্পর্ক হয়নি। শীলাই ছিল তার প্রথম এবং একমাত্র ভালবাসা।
গ্রহের ফেরে মাথাটা গোলমাল… জড়িয়ে ধরে আছে অফিস কলিগ সুখী শ্রাবন্তীকে।
কোমল, মিষ্টি….স্ট্রবেরির চাইতে সুস্বাদু অনাস্বাদিত অনুভূতি। মসৃণ, স্বচ্ছ, মাখনের মত মোলায়েম ত্বক…এক হাতে জড়িয়ে কোমর…ল্যাভেন্ডার সুঘ্রাণ নাকে লাগছে। নেশার মাদকতায় হতবিহবল, উন্মাদের মত আরও একবার পূর্ণ স্বাদ নিয়ে ছেড়ে দেয় সুখীকে।

সুখী পিছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত।
প্লেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলে শূণ্যে ঘুরতে ঘুরতে গড়িয়ে মাটিতে বিকট শব্দে পড়ে গেল যেন সুখী। মাথা বন বন করে ঘুরছে।
সাদী এক পা পিছিয়ে ভাল করে তাকিয়ে দেখে সুখীর মুখে…ভীতসন্ত্রস্ত দৃষ্টি। ভয়ে যেন কুঁকড়ে আছে মেয়েটা।
এবার যেন নিজেকে ঠিক পশু মনে হচ্ছে !
হৃতস্পন্দন এত বেশী, মুখ থেকে কোন শব্দ বের হচ্ছে না, শ্বাস নেয়া দরকার। মনে হচ্ছে কয়েকমাইল জগিং করে এসে প্রচন্ড ক্লান্ত।
চিবুকে হাত বুলিয়ে পরখ করল এই অতর্কিত লুব্ধতার মুহূর্তে…শেভ করা ছিল তো!

আচমকাই সুখী যেন সম্বিত ফিরে পেল। অস্পষ্ট উচ্চারণে যা বলল তার মর্মার্থ হল,
-আমার ফেরা দরকার…অর্পাকে নিতে হবে। এত রাতে রিকশা পাওয়া যাবে না! বলেই নেশাগ্রস্তের মত উলটো দিকে হেঁটে আবার ফিরে এল বসার ঘরে।

অনেকেই তখন ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই ফাঁকে সুখী কাউকে না বলেই বের হচ্ছিল। শাকিল এসে বলে,
-সুখী, দাঁড়া! তোকে পৌঁছে দিব।
-অর্পাকে নিতে হবে চারতলা থেকে। সুখী, কোনরকমে জবাব দেয়।
-তুই ওকে নিয়ে নীচে যা, আমি সাদীকে বলে আসি।

ঠিক তখনই সাদীকে দেখা গেল এগিয়ে আসতে। চোরা চোখে দেখছে তাকে। শাকিল এগিয়ে এসে বলে,
-বস, সুখীকে নামিয়ে দিচ্ছি। রাত হয়ে গেল। আমরাও উঠছি ।
সাদী হ্যান্ডশেক করে বলে, ‘’থ্যাঙ্কস ম্যান”।
সুখী ততক্ষনে ঘর থেকে বের হয়ে লিফটের কাছে। শাকিলের বউ বাথরুমে গেছে। শাকিল অপেক্ষা করে।

সাদী পায়ে পায়ে লিফটের কাছে এসে দাঁড়ালে সুখী অনুচ্চ স্বরে বলে,
-থ্যাংক ইউ !
-রোহান এখনও কার্টুন নিয়ে বিজি ! আই এম গ্ল্যাড ইউ কেইম!
লিফটে পা বাড়িয়েছে সুখী। সাদী ডাকে, ‘’শ্রাবন্তী “। আরও কিছু বলতে চায়।
-আপানার গেস্ট আছে ঘরে…আমি যাচ্ছি !

সাদীর আর কিছু বলা হয় না, লিফট সুখীকে নিয়ে নীচে নেমে যাচ্ছে।

চলবে…

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড.কে. নিপা

Post navigation