মবিন সাহেবের একদিন

মনোয়ার হোসেন
আকুয়া, ময়মনসিংহ।

গল্পঃ মবিন সাহেবের একদিন

মবিন সাহেব সকাল সকাল থলে হাতে বেড়িয়ে পড়লেন কাঁচা বাজারের উদ্দেশ্যে। সপ্তাহে একদিনের বেশী বাজার করা হয়ে ওঠেনা ওনার। সময়ে কুলায় না। ছয়দিন অফিস। প্রাইভেট কোম্পানির চাকুরী, শনিবারেও খাটিয়ে বেতনের টাকা পুরো উশুল করে নেয় অফিস। সপ্তাহ শেষের দুতিন দিন ফেরিওয়ালার কাছ থেকে সব্জী-টব্জী কিনে চালিয়ে দেয় ওনার গিন্নি।

বড় রাস্তার মোড়ে দেখা হয়ে গেল রফিক সাহেবের সাথে। এজিবি অফিসে চাকুরী করতেন। সদ্য রিটায়ার করেছেন। বাড়ি তৈরি করছেন তিনি, প্রায় শেষের পথে। দেড় দুকোটি খরচ হয়ে গেছে দেখেই বোঝা যায়। যেটা তার আয়ের সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। খরচের বৈধতা দিতে ব্যাঙ্ক লোন নিয়েছেন।

– বুঝলেন মবিন সাহেব। একদম পানির মতো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। আরে ভাই ছেলে পুলের জন্য একটা বাড়ি তো অন্তত করে যান। একটা দায়িত্ব আছে না বাবা হিসেবে।

মবিন সাহেব পারতো পক্ষে রফিক সাহেবের মুখোমুখি হতে চান না। দেখা হলেই যে প্রসঙ্গেই কথা হোক শেষতক সেটাকে টেনে বাড়ির গল্পে নিয়ে যান তিনি। বাসায় কোন কোন দেশের ফিটিংস কোথায় কোথায় লাগিয়েছেন, তার বিশদ বর্ণনা দেয়া শুরু করেন। শুনতে শুনতে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে মবিন সাহেবের।

– রফিক সাহেব, আপনার সাথে আমাকে মেলালে তো চলবে না। আমি সওদাগরী অফিসে চাকুরী করি।
প্রাইভেট কোম্পানি। বেতন যা পাই তাতে বাসা ভাড়া দিয়ে কোনমতে মাস পাড়ি দিতে হয়। বাড়ি করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা। আপনি তো সারাজীবন ঘুষের চাকুরী করেছেন, খেয়েছেন ও। সেটা কেউ মুখের উপর না বললেও জানে সবাই। এই যে এতো কোটি কোটি টাকা ব্যায় করে বাড়ি করছেন, তার কয়টা টাকা সৎ উপার্জনের বুকে হাত দিয়ে বলুন তো? জীবনে একটা ফাইলও ঘুষ না খেয়ে পাস করেছেন? আজ হজ্ব করে হাজী সাহেব নাম বাগিয়েছেন। খুঁজলে এখনও পকেটে ঘুষের টাকার পঁচা গন্ধ পাওয়া যাবে। আপনার মতো লোকেরা বিলাসবহুল বাড়ি করবে না তো কে করবে? ঘুষখোর কোথাকার।

– কি মবিন সাহেব, কি ভাবছেন? কথা বলছেন না কেন?
– রফিক সাহেব, এইসব বাড়ি করা আমার মতো লোকের কাজ নয়। আপনি পয়সাওয়ালা মানুষ। আপনি ই তো করবেন।
বলে রফিক সাহেবকে পাশ কাটিয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় মবিন সাহেব। মনের কথাগুলো মুখে আনা হয় না।

সামনে একটা জটলা মতো। জটলার বাইরে দাঁড়ায় মবিন সাহেব। জটলার মাঝখানে এলাকার কাউন্সিলর দাঁড়িয়ে আছে। সাথ দশ-বারো জন লোক। কাউন্সিলর সাহেব কথা বলছেন। কথা না বলে এটাকে বাণী বলাই ভালো।
– এই যে দেখেন, আমার কাউন্সিলর পদের সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সামনে আবার নির্বাচন। এই ক’বছর আপনাদের জন্য দিন তো দিন, রাতকে ও দিন বানিয়ে এলাকার জন্য, এলাকার লোকের জন্য কাজ করেছি। মেয়র সাহেবের সাথে যুদ্ধ করে এই রাস্তাটা পাকা করে দিলাম। এটা কার জন্য? এই রাস্তায় কি শুধু আমার গাড়ি ই চলবে? আপনারা হাঁটবেন না? এখন আপনাদের রিকশায় আর ঝাঁকি লাগবে না। চেল চেল করে রিকশা চলবে। কি বলেন আপনারা? আবার ভোট দিবেন না আমাকে?

– শোনেন কাউন্সিলর সাহেব, এই কয় বছর আপনি এলাকার জন্য কি করেছেন তা সবাই জানে। ড্রেন বানানোর জন্য বাজেট এনে পুরো টাকাটাই পকেটে পুরেছেন, এক পয়সার কাজ না করেই। শেষমেশ এই রাস্তাটা পাঁকা করেছেন ঠিক। ভাইয়ের নামে কাজ এনে করেছেন নিজে। বিয়াল্লিশ লক্ষ টাকার কাজে দশলাখ ও খরচ হয়নি। আর সি সি রাস্তা করার কথা। করেছেন সি সি ঢালাই।দেয়ার কথা পাথর দিয়েছেন ইটের সুরকি। এক ইঞ্চি রডও দেননি। সিমেন্ট বালি কি প্রোপরশনে দিয়েছেন, সেটা যারা ঢালাই এর সময় ছিল তারা সবাই দেখেছে। কেউ কিছু বলেনি। কারণ পানিতে বাস করে কুমিরের সাথে কে বিবাদ করতে যাবে। হ্যাঁ, কুমির ই আপনি, দাঁতাল কুমির। আপনার হিংস্র দাঁতের কামড় থেকে এলাকার তরুণরাও মুক্তি পায়নি। পুরো এলাকার মাদক ব্যাবসা নিয়ন্ত্রণ করেন আপনি। সেটা এলাকার লোক ছাড়া ও প্রশাসনের লোকেরা জানে। টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখেন ওদের। আপনাকে ভোট নয়, আপনার মুখে থুতু দেয়া উচিত।

থুঃ করে এক দলা থুতু ফেলেন পায়ের কাছে, তারপর ভিড়টা এড়িয়ে বাজারের দিকে হন হন করে হাঁটা দেন উনি। মনের কথাগুলো থুতুর সাথে রাস্তায় ছুড়ে মারেন মবিন সাহেব।

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড. কে. নিপা

Post navigation