ব্যান্ডেজ

শাহাদুল চৌধুরী
ডেক্সটন, টেক্সাস, ইউ এসএ।

হরর গল্প: ব্যান্ডেজ

(১)
“আমি মৃত মানুষদের দেখতে পাই।”
লোকটার কথা শুনে একটু নড়েচড়ে বসল রেবেকা। এটি যে তার প্রথম কেস তা নয়, তবে মনোবিজ্ঞানী হিসাবে এটি তার প্রথম ভৌতিক কেস। তাকে প্রায় দুই যুগ পড়াশোনা করতে হয়েছে মনোবিজ্ঞানীর এই তকমা পাওয়ার জন্য। সে ভেবেছিল একজন মানুষের মনোজগতের যে কোন অস্বাভাবিকতার জন্য তাকে প্রস্তুত করা হয়েছে, এখন মনে হচ্ছে সে প্রস্তুত নয়।
(২)
তার বয়স প্রায় ৩০ হতে চলল। ভূত বলে যদি কিছু থাকত , তাহলে অবশ্যই তার সাথে দেখা হত। মনোবিজ্ঞানী হওয়ার আগে তাকে ডাক্তার হতে হয়েছে। তখন নির্জন মর্গে তাকে বহু লাশ ব্যবচ্ছেদ করতে হয়েছে। মানুষ মারা যাওয়ার পরে যদি কিছু থাকতো, তবে সেসব লাশের কোন একটা নিশ্চয়ই তার হাত চেপে ধরতো। আর শুধু যে একটা লাশ তাও নয়, তার পিছনে অসংখ্য লাশ পড়ে থাকত ট্রলির উপর, তার দৃষ্টির বাইরে। ভূতে বিশ্বাস করে নির্জন মর্গে কাজ করা এক রকম অসম্ভব। আর তাই লোকটির দিকে এক রকম অবিশ্বাস নিয়েই সে তাকাল।
(৩)
“আপনি বোধহয় আমার কথা বিশ্বাস করছেন না। ”
“আমি বিশ্বাস করছি কি করছি না, সেটা কিন্তু জরুরী না, আপনি যে বিশ্বাস করছেন সেটা আমি আপনার চোখে দেখতে পাচ্ছি। প্রথমেই আমি আপনাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। একটি ট্যাবু ভেঙে যে আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন, তাতেই আমি যথেষ্ট বিস্মিত হয়েছি। এদেশে আপনি আমার প্রথম বাঙালি রোগী। আমরা বাঙালিরা মানসিক রোগকে কেন যেন কোন রোগ বলে মনে করি না। উট পাখির মত বালিতে মাথা ডুবিয়ে রাখি, ভাবি সর্দি কাশির মতো একসময় নিজেই ঠিক হয়ে যাবে। সেখানে আপনি যে এসেছেন সাহায্য নিতে তাতেই আমি খুশি। এবার যে অসুবিধার কারণে আপনি আমার কাছে এসেছেন, পুরো ব্যাপারটা খুব গুছিয়ে আমাকে বলবেন। আমি কোন নোট নেই না, তবে পুরোটা সময় আমাদের কথোপকথন একটি ভয়েস রেকর্ডারে টেপ হতে থাকবে। আপনি কথা শুরু করুন, প্রথম কবে মৃত মানুষ দেখলেন সে গল্প দিয়ে শুরু করতে পারেন। আমি অবশ্য আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব, মাঝে মাঝে থামাব, এতে অনেক সময় গল্পের ফ্লো নষ্ট হয়ে যেতে পারে, সে জন্য অগ্রিম দুঃখ প্রকাশ করছি।”
(৪)
“আমি প্রথম মৃত মানুষ দেখি বয়সন্ধিকালে। তখন আমার বছর ১২ বয়স। খুব ছোটবেলা থেকেই আমি দাদির সঙ্গে ঘুমাতাম। আমার যখন বছর চারেক বয়স, তখন আমার দাদী বাংলাদেশ থেকে পাকাপাকি ভাবে আমেরিকায় চলে আসেন, আমাদের সাথে থাকবেন বলে। যেহেতু আমরা ছোট্ট একটি বাড়িতে বাস করতাম, দাদির জন্য আমাদের কোন বাড়তি রুম বা বিছানা ছিল না। তার স্থান হয় আমার সাথে। উনি আমেরিকা আসার প্রায় আট বছর পরে মারা যান। এক সন্ধ্যা বেলা তিনি সেলাইয়ের কাজ করছিলেন, তখন হঠাৎ করে তার বুকে ব্যথা উঠে। আমরা এম্বুলেন্স ডাকি। হাসপাতালে যাবার পথে অ্যাম্বুলেন্সে তিনি মারা যান। হাসপাতালে পৌঁছলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক পরীক্ষার পর দাদির লাশটিকে ফিউনোরাল হোমে পাঠিয়ে দেয়। সেখানেই বিপত্তি ঘটে। ওরা দাদির শরীর থেকে পুরোটা বডিলি ফ্লুইড বের করে আমাদের ভিউয়িং এর জন্য ডাকে। আমার মা তখন স্থানীয় মসজিদ থেকে আর কিছু মহিলা নিয়ে তার লাশের গোসল দেন। আমি যখন তাকে দেখতে যাই তখন তিনি কফিনের ভেতর শুয়ে রয়েছেন, পরনে রয়েছে সাদা কাফনের কাপড়। সে কাপড়ের ভিতরে তার হাত দুটো আড়াআড়ি ভাবে রাখা। আমি হঠাৎ লক্ষ্য করি ওনার একটি আঙ্গুল বসা থেকে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটি যে শুধু আমি একলা লক্ষ্য করি তাও না। আমার পাশে দাঁড়ানো ফিউনোরাল হোমের এক মহিলা কর্মচারী বারবার তার আঙ্গুলটিকে বসিয়ে দেবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু যতবারই তার আঙ্গুলটি বসানো হচ্ছিল, ততোবারই তা দাঁড়িয়ে কাফনের কাপড়টাকে তাবুর মত দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল। এই দৃশ্য আমার জন্য সহ্য করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। আমি এক সময় অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ি।কিন্তু সেদিন ছিল দাদিকে দাফন দেবার দিন।অন্যান্য সব অঙ্গ রাজ্য থেকে আমাদের আত্মীয় স্বজনরা এসেছে দাদির দাফন উপলক্ষ্যে। তাদেরকে দ্রুত কর্মস্থলে ফিরে যেতে হবে। সুতরাং আমার উপস্থিতি ছাড়াই দাদির দাফন হয়ে যায় সেই বিকেলে। আমাকে বাসায় নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। আমার যখন ঘুম ভাঙে তখন বেশ রাত।হঠাৎ মনে হচ্ছে কেউ যেন আমার গায়ের চাদরটা ধীরে ধীরে খাটের নীচে থেকে টানছে। আমি তখন দেয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে রয়েছি। আমার পিছন দিকে বাথরুমের দরজা। আপনাকে একটা কথা অবশ্য বলা হয়নি, এটি সেই খাট যেখানে আমি এবং দাদি ঘুমাতাম। আমার দাদীর ডায়াবেটিস ছিল। তাকে মাঝ রাতে উঠতে হত পেশাব করবার জন্য। তিনি যখন উঠে যেতেন তখন ঘুমের ঘোরে আমি তার ফাঁকা হয়ে যাওয়া ঘুমানোর জায়গায় গড়িয়া চলে যেতাম। পেশাব করে ফিরে দাদী খুব বকাঝকা করতেন। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমার পিছনে বিছানাটা যেন একটু ডেবে যাচ্ছে। ভয়ে ভয়ে সেদিকে তাকিয়ে দেখি, দাদি ধীরে ধীরে বিছানায় উঠছে, কিন্তু পরনে দুপুরের সেই সাদা কাফনের কাপড়। সেখান থেকে তীব্র আতর লোবান এর গন্ধ আসছে। দাদির মুখে অবশ্য দেখতে পেলাম না,তার মাথার উপরে বাড়তি কাফনের কাপড় একটি ফিতা দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার ভেতর থেকেই দাদি গজ গজ করে বলছেন, তোকে না বলেছি আমার দিকে আসবি না ।এই দৃশ্য সহ্য করা কঠিন, বিশেষ করে ১২ বছরের একটি ছেলের জন্য। আর তাই ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে আমি দ্বিতীয়বারের মতো জ্ঞান হারালাম।”
(৫)
এই পর্যন্ত বলে ভদ্রলোক সামনে রাখা পানির গ্লাসটির দিকে হাত বাড়ালেন। এই প্রথম রেবেকা লোকটিকে ভালো করে লক্ষ্য করলো। বাঙ্গালীদের তুলনায় লোকটি বেশ লম্বা। চুল বেশ খাটো করে কাটা। চোখ দুটো বেশ আকর্ষণীয়। চশমার পুরু কাঁচও সে আকর্ষণ কমাতে পারেনি। ভদ্রলোক যে কোন একটা বিষয় নিয়ে বেশ চিন্তিত তা উনার চোখ দুটোর দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়। এক চুমুকে পানিটুকু শেষ করে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন।
(৬)
“আপনাকে আমি একটা ভুল কথা বলেছি। আমি বলেছি আমি মৃত মানুষ দেখতে পাই, কথাটা ঠিক না। আমি শুধু সেইসব মৃত মানুষকে দেখতে পাই যারা একদিন আমার খুব প্রিয় ছিল। আপনি আমার চার্ট দেখবার সময় পেয়েছেন কিনা জানি না, আমি পেশায় একজন সৈনিক। আমাকে বছরের ছয় মাস বনে কাটাতে হয়। সাধারণত এক মাস অন্তর অন্তর আমরা বনে কাটাই, বিভিন্ন অনুশীলনের জন্য।বনের ভিতরে গভীর রাতে যে কি রকম অন্ধকার হয় আপনি চিন্তা করতে পারবেন না, নিজের হাতটা পর্যন্ত ঠিক মত দেখা যায় না। সেই সব বনে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় নিশ্চয়ই অনেক সৈনিক মারা গেছে। সবার যে কবর হয়েছে এমন তো না। সুতরাং সব মৃত মানুষ দেখতে পেলে, কবর হয়নি এমন সব অতৃপ্ত আত্মাদের সাথে আমার নিশ্চয়ই দেখা হতো। কিন্তু আমি তাদের কখনো দেখিনি।”
” আপনার দাদি ছাড়া আর কোন মৃত মানুষকে কি আপনি দেখতে পেয়েছেন?”
” জি পেয়েছি। আমার হাই স্কুলের সবচাইতে প্রিয় বন্ধু। ওর নাম ছিল ক্রিস্টোফার, আমরা সংক্ষেপে ডাকতাম ক্রিস। ও ছিল cross-country রানার। সেজন্য ও স্টেট লেভেল এ পুরস্কার পর্যন্ত পেয়েছে। ওর একটা স্বপ্ন ছিল একদিন অলিম্পিকে আমেরিকার হয়ে সোনা জিতবে। কিন্তু ওরা ওর শরীরে ড্রাগের অস্তিত্ব পায়। ওকে অলিম্পিকের জন্য নির্বাচন করা হয় না। এটাতে ও এতটাই মুষড়ে পড়ে যে এক রাতে ও আমাদের পার্শ্ববর্তী শহরে গিয়ে ট্রেন লাইনের উপরে শুয়ে পড়ে। ওর পা দুটো ওর শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ব্যাপারটা আমার মনের ভিতর ভীষণ চাপ ফেলে। এটা দাদি মারা যাবার বছর ছয়েক পরের ঘটনা। ও মারা যাবার দিন দুয়েক পরে এক রাতে ও আমার ঘরে আসে। আমি ঘুমাতে এসেছি বেশ অনেকক্ষণ হয়। কিন্তু অস্থিরতার কারণে ঘুমাতে পারছি না। ঘরের আলো কমিয়ে রেখেছি, কিন্তু একেবারে অন্ধকার নয়। এই অবস্থায় হঠাৎ করে শুনতে পেলাম কে যেন আমাকে ডাকছে বাড, তুমি আমার একটু উপকার করতে পারবে? এই নামে তখন পৃথিবীতে আমাকে একজনই ডাকে, আপনাকে আগেই বলেছি ক্রিস আর আমি ছিলাম বুঝুম বাডি। আমরা সংক্ষেপে একে অপরকে বাড ডাকতাম। ওর ডাক শুনে আমার সারা শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু কোথাও ওকে খুঁজে পাচ্ছি না। ও তখন বললো ওপরে তাকাতে। ফিরে তাকিয়ে দেখি ও আমার ছাদের সমান্তরালে গ্যাস বেলুনের মতো ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে।ধীরে ধীরে ঘুড়ি যেভাবে নিচে নেমে আসে ঠিক সেভাবে আমার সামনে এসে ভাসতে থাকলো। ভালো করে তাকিয়ে দেখি পরনের হাত কাটা গেঞ্জির নিচে যেখানে পা থাকার কথা সেখানে পুরোটাই ফাঁকা। আমার দাদীকে দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম, কিন্তু ততদিনে আমি মৃত মানুষের সাথে কথা বলায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিচে নেমে আমার পাশে এসে ও বলতে শুরু করল, তুমি তো জানো কালকে আমাকে কবর দেবে। আমার খুব ইচ্ছা cross-country রানিং এর জন্য যে মেডেল আমি জিতেছিলাম তা যেন আমার সাথে কবর দেয়া হয়। আমার পরিবারেরও সেই রকম ইচ্ছা, কিন্তু ওরা জানে না মেডেলটা আমি কোথায় রেখেছি। তোমার মনে আছে আমার বিছানার হেডবোর্ডের দুই কোনায় দুটো গম্বুজের মতো ছিল, যার একটি লাইট বাল্বের মত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুলে ফেলা যেত, যেখানে আমরা ড্রাগ লুকিয়ে রাখতাম, সেখানেই ওটা আমি রেখেছিলাম, যেন সব সময় আমার হাতের কাছে থাকে, এখনো আমি তাই চাই, এটা যেন আমার কফিনের ভেতর থাকে। তুমি কি আমার ভাইকে এর সন্ধান দিতে পারবে? এই কথাটা বলেই ও হঠাৎ করে আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই ছায়ায় মিলিয়ে গেল। তারপর থেকে এরা দুজন আমার সাথেই রয়েছে।”
(৭)
এই পর্যায়ে রেবেকা তার রোগীকে থামিয়ে দিল।
“আপনি কিছু মনে করবেন না ।আপনাকে আমার এখন একটু থামাতে হবে। আপনি বলছেন দুজন মৃত মানুষ আপনার সাথেই থাকেন, যাদের আপনি প্রায়ই দেখতে পান,এদের অস্তিত্ব আপনি কিভাবে টের পান, একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?”
“অবশ্যই। সেজন্যই তো আপনার কাছে আসা। আপনি জানেন কিনা জানি না, আমার এক সপ্তাহ আগে আপনার কাছে আসার কথা ছিল। কিন্তু আমাকে সেই অ্যাপোয়েন্টমেন্ট টা ক্যানসেল করতে হয়। কারণ
শুনলে আপনি আশ্চর্য হয়ে যাবেন। আমি তাড়াতাড়ি সেদিন অফিস থেকে বেরিয়ে বাসায় গেছি, আর্মি ইউনিফর্ম বদলে সিভিলিয়ান কাপড় পড়বো। কাপড় বদলে এসে দেখি যেখানে গাড়ির চাবি রাখি, সেখানে চাবি নেই। নেইতো নেই, সারা বাড়ি খুঁজে আমি হয়রান। যখন আশা ছেড়ে দিয়ে সোফায় গিয়ে বসেছি, হঠাৎ করে দেখি আমার ডিভিডি প্লেয়ার টা নিজে নিজে ডিস্ক লোড হবার জন্য বের হয়ে আসছে আবার ঢুকে যাচ্ছে। সন্ধ্যা বেলা কি একটা কাজে রান্না ঘরে গিয়েছি, তার কাছেই রয়েছে ডাইনিং রুম, সেই ডাইনিং রুমের দরজা খুললেই আমার গারাজ। সেই দরজার পাশে একটা কাঠের তৈরি বড় চাবি রয়েছে, যার মাঝে বেশ কিছু পেরেক পোঁতা রয়েছে। সেই পেরেক গুলোর একটাতেই সাধারণত আমি গাড়ির চাবি রাখি। তাকিয়ে দেখি চাবিটা যথা স্থানে রয়েছে, অথচ আমি নিশ্চিত বিকেলবেলা চাবিটা ওখানে ছিল না। এটা গেল এক দিনের ঘটনা, এরকম অসংখ্য ঘটনা আপনাকে বলতে পারি, কিন্তু আমার জন্য সময় বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১ ঘন্টা।”
“না আপনি ঠিকই বলেছেন ,আমাদের সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, আপনি কি যাবার আগে আর কিছু বলতে চান আমাকে?”
“সেশন এর শুরুতে আপনি বলেছিলেন, আমি যে অসুবিধার কারণে আপনার কাছে এসেছি তা যেন বলি, আমি আপনাকে প্রায় সব ঘটনাই বলেছি, তবে একটি ছাড়া। আপনি যদি আমার এই সমস্যাটা সমাধান করতে পারেন, তবে আপনাকে আমি সেই কথাটা বলব। আমি কি আগামী শুক্রবার আবার আসবো? আমি ক্লার্ক্সভিল শহরে থাকি। সেখান থেকে ন্যাশভিল শহরের দূরত্ব প্রায় আধাঘন্টা। আমার জন্য শুক্রবার আসতে সুবিধা হয়। অন্যান্য দিন আমাকে খুব ভোরে উঠে কাজে যেতে হয়, কিন্তু শনিবার আমার ছুটি। ফিরে যেয়ে আমাকে খুব ভোরে উঠতে হবে না। কারণ ফিরতে ফিরতে আমার বেশ রাত হয়ে যাবে।
“আপনি এই শুক্রবার না ,তার পরের শুক্রবার আসেন। একই সময়।
(৮)
রেবেকা যখন ডেন্টন নামের টেক্সাসের সেই ছোট্ট সুন্দর শহরটিতে এসে পৌঁছাল, চারদিক অন্ধকার করে তখন সবে সন্ধ্যে নামছে। কমলা রঙের মিষ্টি নম্র রোদ অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরোটা শহরে। সন্ধ্যার সেই দীর্ঘ ছায়া পিছনে ফেলে রেখে রেবেকা যখন ভদ্রলোকটির আদি বাড়ির গাড়ি বারান্দায় ট্যাক্সি থেকে নামল, তখন সত্যি সত্যি সন্ধ্যা নেমে গেছে। ভদ্রলোকের মা তখন মাগরিবের নামাজ পড়ছিলেন। রেবেকাকে কলিংবেল টিপে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলো।৷ তবে ভদ্রমহিলা দরজা খোলার পর উনার আন্তরিকতায় রেবেকা মুগ্ধ হয়ে গেল। উনি কিছুতেই রেবেকাকে হোটেলে যেতে দিবেন না। রেবেকাকে আসিফের সেই ঘরটিতেই রাত কাটাতে হলো, যেখানে বয়সন্ধিকালে সে প্রথম তার মৃত দাদিকে দেখতে পেয়েছিল। রেবেকার অবশ্য সে ধরনের কোন অভিজ্ঞতা হল না। সারা সপ্তাহের কাজের শেষে তাকে প্লেনে উঠতে হয়েছিল। ক্লান্তির কারনে এক ঘুমে রাত কাবার হয়ে গেল।
(৯)
পরদিন সকালে নাস্তার পর আসিফের মা রেবেকাকে সেই ফিউনোরাল হোমে নিয়ে গেলেন, যেখানে তার দাদিকে রাখা হয়েছিল। অনুসন্ধানে একটি নতুন তথ্য বের হয়ে আসলো, যা আসিফ তাকে বলেনি। এই তথ্যটি কি আসিফ ইচ্ছে করে তার থেকে লুকিয়েছে নাকি সে জানতো না এটা জানা রেবেকার জন্য খুবই জরুরী ছিলো। ফেরার পথে প্লেনে বসে সে এই রহস্যের জাল খুলে ফেলল।
(১০)
পরের শুক্রবার আসিস যখন তার সাথে দেখা করতে আসলো, তখন সে কথা শুরু করল এই বলে,”হিন্দুরা পাথর নিয়ে খুব সুন্দর একটা কথা বলে। ওরা বলে বিশ্বাস করলে ভগবান, না হলে এটা শুধুই একটি পাথর। আমি আপনাকে যা বলব আপনি বিশ্বাস করলে এটা আপনার জন্য উপকার হবে। প্রথম আপনার দাদির সাথে দেখা হওয়ার ঘটনাটা দিয়ে শুরু করি। আপনি আমাকে বলেছিলেন আপনার দাদুর বুকে ব্যথা হওয়ার সময়টিতে তিনি সেলাই করছিলেন। আপনি কি জানতেন, হঠাৎ বুকে ব্যথা হওয়ায় তিনি সেখানে হাত দিতে গিয়ে হাতের কাঁচি দিয়ে অন্য হাত কেটে ফেলেন? অ্যাম্বুলেন্সে প্যারামেডিকরা রক্ত থামানোর জন্য সেই জায়গাটিতে একটি ব্যান্ডেজ লাগায়। উনার মৃত্যুর পর ফিউনোরাল হোমের লোকেরা সেই ব্যান্ডেজ না খুলেই তাকে অন্তঃসারশূন্য করার প্রক্রিয়া শুরু করে, যার কারনে তার কাটা আঙ্গুলটিতে বাইরে থেকে বাতাস ঢুকতে থাকে। আর খুব সম্ভবত সে কারণেই আঙ্গুলটি বারবার দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলো,আমার ধারণা আহত হবার কারণে আঙ্গুলটিতে আনিবেন প্রেশার ক্রিয়েট হয়েছিল, অথবা আঘাতের কারণে টেন্ডন ইঞ্জুরি হয়ে থাকতে পারে। আপনার ১২ বছরের মনে ব্যাপারটি ভীষণভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে, যার কারনে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে আপনি আপনার দাদিকে দেখতে পান। আমার ধারণা এর শুরু আরো আগে।চার বছর বয়সে আপনি যখন একলা ঘুমাতে শুরু করেন, তখনই একাকীত্ব ঘিরে ধরে আপনাকে। আপনার দাদির সাথে সে একাকীত্ব সাময়িক ভাবে ঘুচে যায়। কিন্তু দাদী মারা গেলে আপনার অবচেতন মন সেই একাকীত্ব ঘোচাতে আপনার দাদিকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে আপনার জীবনে। এবার আপনার বন্ধুর ঘটনায় আসি। ইংরেজীতে একটা কথা আছে , history repeats itself. ইতিহাসে একই ঘটনা ঘুরেফিরে বারবার ঘটে। আপনার বন্ধু মারা গেলে একাকীত্ব ঘিরে ধরে আপনাকে দ্বিতীয়বার। আপনার কথা থেকে আমি জানতে পারলাম সেই সময় আপনারা ড্রাগ লুকিয়ে রাখতেন, খাটের কোন একটা গম্বুজ এ। আমার ধারণা বন্ধুর বিরহ সইতে না পেরে আপনি হয়তো বা সেদিন কোন একটা রেক্রিয়েশনাল ড্রাগ নিয়েছিলেন ।অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ড্রাগ মাইন্ড অলটারিং অভিজ্ঞতা দেয়। আপনি সে নিষিদ্ধ ড্রাগ এর সহায়তায় আপনার প্রিয় বন্ধুকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন আপনার একাকি জীবনে। আপনার অবচেতন মন অবশ্যই আপনাকে আরো একবার সহায়তা করে। এরা দুজন বন্ধুর মত আপনার জীবনে ছিল দীর্ঘদিন। আর তাই আপনি যখন আমার কাছে সাহায্য চাইতে আসবেন ঠিক করলেন, তখন আপনার অবচেতন মন চাবিটিকে লুকিয়ে ফেলে, যেন সেদিন যথাসময়ে আপনি আমার সাথে দেখা করতে না আসতে পারেন। এবার শেষ ঘটনাটাতে আসি। আপনি আজকে বাসায় যেয়ে যদি আপনার ডিভিডি প্লেয়ারের রিমোট কন্ট্রোল খুলে ব্যাটারি গুলো বের করে রাখেন, তবে আমি নিশ্চিত ডিস্ক লোডার স্বয়ংক্রিয় উপায়ে আর বের হয়ে আসবে না। আমার ধারণা আপনার রিমোর্ট কন্ট্রোলের ইজেক্ট বাটনটি মেলফাংশন করছে। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি সব কিছু ব্যাখ্যা করতে, এখন কি আমি সেই ঘটনাটি জানতে পারি যার জন্য আপনি আমার কাছে এসেছিলেন?”

(১১)
পাঠক ,আমি জানি না সেই বিশেষ ঘটনাটি আসিফ রেবেকাকে বলবে কিনা,তবে আমার মনে হয় আপনাদের ঘটনাটা জানানো দরকার। আসিফ বিয়ে করেছিল দীর্ঘদিন আগে, কিন্তু তার স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে চলে যায়। স্বামী মৃত মানুষ দেখতে পায় এটা খুব কম মেয়েই সহজ ভাবে নিতে পারবে। সে হিসাবে মেয়েটিকে দোষ দেয়া যায় না, তবে মেয়েটি যাবার সময় তাদের একমাত্র মেয়েটিকে আসিফের কাছে ফেলে রেখে চলে যায়। মেয়েটির বয়স খুবই কম, মাত্র ছয় বছর। সে এক দুপুর বেলা তার প্রিয় বার্বি পুতুলটিকে নিয়ে কাপড় রাখার ক্লজেটে খেলতে যায়। হঠাৎ করে সে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আসিফের কাছে দৌড়ে আসে।
“বাবা ডেভিড আমার সাথে অনেক রাগ করছে, কেন আমার কোনো খেলনা গাড়ি নেই। বাবা তুমি কি ওকে একটু বলবে,ছোট্ট মেয়েরা গাড়ি দিয়ে খেলে না ,এরা পুতুল দিয়ে খেলে! তাই আমার কোন গাড়ি খেলনা নেই।”
আসিফ ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলো মেয়ের কথা শুনে, যদিও সে তা তার মেয়েটিকে কিছু বুঝতে দিল না। খুবই সহজ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, ডেভিড কে মা?”
” ওই যে ক্লজেটে গলায় দড়ি বাঁধা যে ছেলেটা ঝুলে থাকে, তোমার আর্মির স্যুটের পিছনে। বাবা ওর গলায় দড়ির দাগগুলো দেখলে আমার খুব ভয় লাগে।”
আসিফের ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। সারাটা জীবন সে যে কষ্ট নিয়ে বাঁচলো, নিজের অজান্তেই সে অসুস্থতা ছড়িয়ে গেছে তার মেয়ের মাঝে। তার মতো তার মেয়েটিও মৃত মানুষ দেখতে পায়। সে এখন কি করবে? আমরা যেমন মেঝের গর্ত খুব সুন্দর কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখি, সে কি তাই করবে, নাকি সে রেবেকার ব্যাখ্যা বিশ্বাস করেছে? রেবেকা কি তার আস্থা অর্জন করতে পেরেছে? নিজের মত সে কি রেবেকার কাছে তার মেয়ের জন্য সাহায্য চাইবে? আপনাদের কি মনে হয়?
রচনাকাল জুলাই দুই হাজার উনিশ
ডালাস টেক্সাস ইউএসএ!

অচিনপুর ডেস্ক/ এসএসববি

Post navigation