বেঁচে থাকাই এক আশীর্বাদ

বন্যা হোসেন
অটোয়া, কানাডা।

গল্পঃ বেঁচে থাকাই এক আশীর্বাদ

–বহু বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমি একা থাকায় সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমার সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল।
–কিন্তু আন্টি, এই একাকিত্ব আপনার ভাল লাগে? বয়স হয়েছে…হঠাৎ যদি কিছু হয়ে যায়?
–যা হবার হবে। অত ভেবে কি হবে? সাহস নিয়ে শির উঁচু করে বেঁচে আছি।

কথা হচ্ছিল হঠাৎ পরিচিত হওয়া এক আন্টির সাথে। কাজ থেকে ফেরার পথে এই দূরত্বটা চোখ বন্ধ করে ঘুমাতে ঘুমাতে চলে যাই। বাসের শেষ স্টপেজ বলে নিশ্চিন্ত মনে চোখ মুদে থাকা যায়। মাত্র মিনিট পনের পরেই এক যাত্রী পাশে বসেছেন টের পেয়ে চোখ খুলে দেখলাম।

হুম, আমাদের ওদিককার অর্থাৎ দেশি, ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানি হতে পারে। বয়স্কা ভদ্রমহিলা ভারী শীতের কোট পরেছেন, টুপি, গ্লাভস সবই বেশ দামী বোঝা যাচ্ছে। আমি একনজর চোখ বুলিয়েই আবার তন্দ্রায় নিমগ্ন হলাম। কয়েক মিনিট পরেই সহযাত্রীর ফোন বেজে উঠল। ফোনে কথা বলা শুরু করতেই বুঝে গেলাম ইনি আমার দেশেরই লোক। এত বছর ধরে এদেশে আছি তারপরও দেশি কাউকে হঠাৎ রাস্তা-ঘাটে দেখলে উদ্গ্রীব হয়ে যাই কুশল বিনিময়ের জন্য। পাশের বয়স্কা তার ছেলের সাথে কথা বলছেন বুঝলাম। বউমা, নাতিদের খোঁজ নিচ্ছেন। ফোন রাখার পর নিজেই পরিচিত হতে উদ্যত হলাম।

-আন্টি, আপনি বাংলায় কথা বলছেন শুনে খুব ভাল লাগছে। আমিও বাংলাদেশ থেকে।

ভদ্রমহিলা মিষ্টি হাসি হাসলেন। চামড়ায় ভাঁজ পরা ছোট মুখখানিতে বিগত যৌবনের সৌন্দর্যের আভাস। কানে হীরে বসানো দুটি বিন্দু…জ্বলজ্বল করছে। সামান্য লিপিস্টিক ছোঁয়ানো ঠোঁট, হালকা মাশকারা লাগিয়েছেন ভাল করে দেখলে বোঝা যায়। দুই হাতের আঙ্গুলে চারটি হোয়াইট গোল্ডের আংটি। পরিস্কার ফাইল করা নখ রংবিহীন ম্যানিকিউর করা। নিজের বেশ যত্ন নেন বোঝা যায়। দেশি আন্টিরা এরকম বয়সে অনেকেই জীবনের উপর বিতৃষ্ণা বা ক্লান্তিতে বা জরা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বয়স নিশ্চয়ই সত্তরের কাছাকাছি হবে। কিন্তু কি সুন্দর ফিটফাট রেখেছেন নিজেকে।

-হ্যাঁ, দেশি কাউকে দেখলে আর বাংলায় কথা শুনলে খুব খুশী হই। আপনি কোথায় থাকেন?

-আমি কুইন স্ট্রিটে থাকি। আন্টি, আমাকে তুমি করেই বলুন, প্লিজ।

-আচ্ছা। অনেক ছোটই হবে বয়সে। কুইন স্ট্রিটে রেশমারা থাকে। চেনো নাকি?

–জি আন্টি। চিনি ওদের। আগে খুব যাতায়াত ছিল, বাচ্চারা যখন ছোট ছিল। ইদানিং যোগাযোগ কমে গেছে। রেশমাপাও বেশিরভাগ ছেলের কাছেই থাকেন। শুনেছিলাম, বাড়ি বিক্রি করে দেবেন।

-হুম, ঠিকই শুনেছ। ওরা ছেলের কাছেই চলে যাবেন ঠিক করেছেন।

-আপনি কোন এলাকায় থাকেন ?

-ভিক্টোরিয়া এভিনিউতে।
এভাবেই আলাপচারিতায় জমে গেলাম। আন্টির নাম জাহিদা আক্তার। স্বামী মারা গেছেন প্রায় কুড়ি বছর আগে। কানাডায় বসবাস করছেন প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর। দুই ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্বামীর সঙ্গে কাটিয়েছেন। তাঁর প্রথম সন্তানকে নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন পঁচিশ বছর বয়সে। ইরাক, সৌদি আরব, লিবিয়া, উগান্ডা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, রুমানিয়া, মিশর, আমেরিকা ঘুরে শেষ পর্যন্ত কানাডায় বসতি। স্বামী ছিলেন ডাক্তার। ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার সাথে সাথে কিছুদিন পর পর বিভিন্ন দেশে সংসার পাতা আন্টির জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। তাই কানাডায় আগমন।

জাহিদা আন্টির সাথে কথা বলতে বলতে নিমেষেই যেন গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। বাস থেকে নামার আগে আন্টি আমার ফোন নম্বর চেয়ে নিলেন। এরই মাঝে আমার নাম্বারে মিস কল এবং মেসেজ ফ্রম জাহিদা আক্তার চলে এল।
কেতাদরস্ত, রুচিশীলা ভদ্রমহিলা আধুনিকতায় অভ্যস্থ দেখে ভাল লাগল। অনেক বয়স্করাই এখনো স্মার্ট ফোন ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত নন। এই রমণী তার ব্যতিক্রম নিঃসন্দেহে।

ফোন নম্বর বিনিময় হলেও আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা ভুলে যাই হঠাত পরিচয় হওয়া পথচারীকে। কোন সময় মনের অজান্তে স্মৃতির মণিকোঠায় ভেসে এলেও ভাবি, ফোন করব? কি দরকার? আধুনিক মানুষের অনেক সমস্যা। যদি উনি ব্যস্ত থাকেন? কিই-বা মনে করবেন?
আচ্ছা, দেখি উনি কল দেন কিনা!
এইসব সাতপাঁচ ভেবেই সময় নষ্ট করি। আগের জেনারেশন হয়তো এর চাইতে সহজ ছিলেন। অন্যের প্রাইভেসির কথা এতটা তাঁরা ভাবতেন না।

কিন্তু মেঘে মেঘে বেলা কম যায়নি। আমারও বয়সটা থেমে নেই, মধ্যবয়সের দ্বারপ্রান্তে এসে আমিও আজকাল নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হই। একাকিত্ব আমাকেও যন্ত্রণা দেয়। মায়ের বয়সী এক স্বাবলম্বী বয়স্কার কথা মনে পড়ে মাঝে মাঝে।

বিষণ্ণ, মেঘলা, তুষারশোভিত এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে জম্পেশ করে আদা, দারুচিনি, এলাচ ছেঁচে কড়া দুধ চা আর নিমকি সামনে নিয়ে ফোনটা করেই ফেললাম। কয়েকবার রিং হতেই উত্তর দিলেন জাহিদা। একবার বলতেই চিনতে পারলেন।
-প্রীতি, তোমার কথা ক’দিন যাবত মনে পড়ছিল। ভাল হয়েছে ফোন করেছ। একদিন চলে এসো না। অনেক গল্প করবো।
-আসব, আন্টি। নাকি আপনিই আসবেন আমার এখানে?
-তুমিই এসো। আমি একা থাকি। গল্প করা যাবে। সময় নিয়ে এসো।

এই তো মুশকিল। সংসারী মানুষের জন্য সময় বের করা প্রায় অসম্ভব… শুধুমাত্র নিজের জন্য। সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজের পরে পুরো সময়টাই পরিবারের জন্য দিতে হয়। স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী যাই বলে দাবী করি না কেন, পরিবারের শেকল যে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা। আমার স্বামী পরাগ ভালমানুষ হলেও অল্প কিছু মানুষকে ঘিরে তাঁর পৃথিবী। কাজের পরে পরিবার, ছেলেমেয়ে, বাবা-মায়ের যত্ন ছাড়া আর কিছু বোঝে না। আমাদের নিজস্ব কোন সময় কখনোই ছিল না। এখনো নেই। তাঁর কাছে এসবের কোন মূল্যই নেই।

কাজের পর ঘরে ফিরে রান্না, ছেলেমেয়ের পড়া দেখা, শ্বশুর- শাশুড়ির যত্ন করা। ছুটির দিনে দেশি বন্ধুদের বাসায় দাওয়াত, পাল্টা দাওয়াত ছাড়া আর যেন কিছুই করার নেই। শুধু দায়িত্ব পালন আর কর্তব্য করেই জীবন শেষ। আজকাল আমার নিভৃতে একটু অবসর পেতে ইচ্ছে করে। পছন্দের কারো সাথে দুদন্ড জিরিয়ে গল্প করতে ইচ্ছে করে। খুব সামান্যই চাওয়া; তাও মেলে না।
ভেবে দেখলাম, এ সংসারে নিজস্ব বলতে আমার কিছু নেই। বাড়িটা কেনা হয়েছে দুজনের নামে মর্টগেজ পেতে সুবিধে ছিল বলে। বেতনের টাকা যৌথ একাউন্টে চলে যায়। আমার খুব সামান্যই খরচ। সবকিছু পরাগের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি আমার একাউন্টের পিন কোডও তার জানা। ক্রেডিট কার্ড আমার আছে নামমাত্রেই। পরাগই অনলাইনে সব কেনাকাটায় ব্যবহার করে। আমার সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস সেই কিনে দেয়। শ্বশুর-শাশুড়ি খারাপ মানুষ নন, তবে তারা তাদের ছেলেকে চোখে হারান। আমার ভূমিকা খুব সামান্যই সেখানে। কোন কিছু নিয়েই প্রতিবাদ করি না, সহজে মেনে নেই..নিজস্ব কোন চাহিদার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি সংসারের যাঁতাকলে পড়ে। কিভাবে যে এতগুলি বছর কেটে গেল বুঝতেই পারিনি।

এখানে আমার নিজস্ব কোন বন্ধু নেই। সবাই পরাগের বন্ধু আর তাঁদের বউয়েরা। সকলের সাথেই আমার ভাল সম্পর্ক কিন্তু প্রচুর পরশ্রীকাতরতা আর লেগ পুলিং চলে। কে কার চেয়ে ভাল চাকরি করে, কে কত বড় বাড়ি কিনেছে বা কিনবে, কার কয়টা গাড়ি, কার ছেলেমেয়ে কত ভাল ইউনিভার্সিটিতে কত স্কলারশীপ পায়…আর আছে শাড়ি কেনার ফিরিস্তি মহিলাদের।
আমার ক্লান্তি লাগে চিরকাল এসব গল্পে। কিছুতেই স্রোতে গা ভাসাতে পারলাম না। স্রোতের উল্টোদিকে গিয়ে নিজস্ব জগত তৈরী করাও আর সম্ভব নয়, সংসারে ঝামেলা হবে।

আমি যে ছাপাখানায় কাজ করি সেটাই আমার নিজস্ব জগত। মিশেল, আন্দ্রেয়া, লিয়া, রায়ান আর আমি… খুব সখ্যতা আমাদের। বহুবছর ধরে আছি বলে সামান্য কর্মী থেকে আজ সুপারভাইজার হয়েছি। মিশেল আর আমার সংসার আছে। বাকিরা ডিভোর্সি…অনেক সমস্যার মাঝেও কাজে এসে আমাদের মুক্তি মেলে।
ওদের মধ্যে রায়ানই কয়েক জেনারেশন আগে আসা কানাডিয়ান। লিয়া চাইনিজ, আন্দ্রেয়া রুমানিয়ান আর মিশেল ঘানা থেকে আসা আমার মতই অভিবাসী। দুপুরের খাবারটা একসঙ্গেই খাই …বিভিন্ন দেশী খাবারের স্বাদ নেয়া এক আনন্দময় অভিজ্ঞতা। মন খুলে হাসি আর আড্ডা দিয়ে প্রতিদিন সতেজ হই আর ঘরে ফিরে অপেক্ষা করি কখন ভোর হবে।

একেবারে আচমকাই সুযোগ মিলে গেল লটারী পাওয়ার মতই। যেন পরাগ আমাকে একা বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে এমনই খুশি হলাম। ননদের কাছে বাবা মাকে মিশিগানে পৌঁছে দিতে গেল পরাগ এক শুক্রবার। আমাকে জিজ্ঞেসও করেনি যাব কিনা! লোকটা নিজের মত করেই ভাবে চিরকাল। আগে মন খারাপ হত…এখন আর ভাবি না। বরং খুশী হই। দুটো দিনের জন্য ঘরটা ফাঁকা পাওয়া যাবে। নিজের পছন্দের কয়েকটা মুভি দেখব। ছেলে মেয়ে ইউনিভার্সিটির পর নিজের কাজ নিয়ে ছুটির দিনেও ব্যস্ত থাকে।

শুক্রবার কাজ থেকেই ফোন করে নিলাম জাহিদা আন্টিকে। আন্টি বললেন, শনিবার সকালেই যেন পৌঁছে যাই। আন্টির জন্য কিছু খাবার দাবার রাতেই তৈরী করে রেখেছি। সকাল সকাল ফারের কোট, বুট জুতা আর টুপি, দস্তানা নিয়ে বেরিয়েছি। বাস আর ট্রেন যাত্রার পর বিশ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম আন্টির বাড়ির দোরগোড়ায়। ছিমছাম একতলা বাংলো বাড়ি।

গতরাতের তুষারশোভিত শুভ্র সাদা ড্রাইভওয়ে পার হয়ে সাদা দরজায় বেল বাজালাম। জাহিদা একগাল হাসি দিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ালেন। শীতবস্ত্র থেকে নিজেকে মুক্ত করে আন্টির পিছু পিছু রান্নাঘরে হাজির হলাম। শুরু হল আমাদের গল্প।

এত খোলামেলা গল্প কারো সাথেই করিনি কখনো। আমার অতি সাধারণ জীবনের মূল্যহীন গল্প করলাম।
আন্টি চোখ বড় বড় করে বললেন, দেখ মেয়ে, জানি না তোমার কি সমস্যা! তবে যাই কর নিজের জন্য সামান্য সময় বের করে নিজের পছন্দগুলো পুরণ করাটা তেমন কঠিন কিছু না।

-আন্টি, এতবছরে আমার নিজের যে কি পছন্দ তাই ভুলে গিয়েছি। ছেলের, মেয়ের, পরাগের, বাবা মায়ের পছন্দের খেয়াল রাখতে গিয়ে আমার নিজস্ব শখ, ইচ্ছেগুলো হারিয়ে গেছে। ওদের সবার পছন্দই আমার পছন্দ। নিজস্ব শখ, ইচ্ছের ডালপালা ছেঁটে ফেলেছি বহু আগেই…নতুবা সমস্যা হয়, অশান্তি হয়। কারই-বা এত অশান্তি ভাল লাগে! ঝগড়া অশান্তি থেকে আমি দূরে থাকতে চাই।

-বুঝেছি, তুমি নিজের জীবন আত্মত্যাগ করার দলে। আমাকে জিজ্ঞেস করেছ কেন একা থাকি? আমিও শান্তি চাই বলেই একা থাকি।
আমার চার ছেলেমেয়ের সবার নিজের সংসার, নিজেদের জীবন নিয়ে ওরা ব্যস্ত। আমি নিজেও এতগুলো বছর বিদেশে থেকে ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। স্বামী মারা গেছেন বলেই নিজেকে অবলা ভাবি না। সংসারের চাপে আর স্বামীর বিভিন্ন জায়গায় চাকরির সুবাদে আমার নিজস্ব কেরিয়ার তৈরী হয়নি। টুকটাক এটা সেটা করেছি সময় কাটানোর জন্য। বড় ছেলে চায় তার বাসায় গিয়ে থাকি, মেয়েরা ভাবে মায়ের উপর তাদের অধিকার বেশি, ছোট পুত্র কোলপোছা বলে তার দাবী সবার চেয়ে বেশি। আমি কি চাই কেউ জানতে চায় না। ওরা চাইলেই তো হল না…ওদের প্রত্যেকের জীবনসঙ্গীদের ইচ্ছাকেও তো প্রাধান্য দিতে হবে।
বড় ছেলের বাসায় তার শাশুড়ি থাকে সারা বছর। আমি গেলে ওঁর সঙ্গে একই ঘরে থাকতে হয়। দু’চারদিন থাকি…কিন্তু দীর্ঘদিন ওভাবে থাকা যায় না।
দুই মেয়ের বাসায় মাঝে মাঝেই যাই। নাতি নাতনিরা পথ চেয়ে থাকে। জামাইরাও খারাপ মানুষ নয়। কিন্তু আমি গেলে ওদের স্বাধীনতায় ব্যাঘাত ঘটে।
ছোট ছেলে মা,মা করে অস্থির। কিন্তু তার বউ বিদেশি কন্যা। খুবই লক্ষ্মী মেয়ে আলিনা। কিন্তু সেই একই কারণে ওখানেও গিয়ে দুদিন বেড়িয়ে চলে আসি নিজস্ব আস্তানায়।
এ বাড়িটা আমার চার ছেলেমেয়ে কিনেছে আমার নামে। আমার মৃত্যুর পর ওরা এবাড়ি বিক্রি করে চারভাগ করে নিবে। সেভাবেই দলিল করা আছে।
আমি নিজের মত ঘুরে বেড়াই। কিছু বুড়ো-বুড়ি বন্ধু বান্ধব আছে। গাড়ি আর চালাই না। বাসে, ট্রেনে করেই এদিক সেদিক যাই। এখানে বুড়োদের ব্যস্ত রাখার নানারকম ছল, বাহানা আছে…অর্থাৎ, বিভিন্ন সংস্থা থেকে বুড়োদের জন্য নানা রকম স্বেচ্ছাসেবী কাজের ব্যবস্থা আছে। নিয়মিত ওদের সাথে কাজও করি।

-তারপরও তো ঘরে ফিরলে আপনি একাই ? দেশে যান না?

–একা কোথায় আমি? আমার বেশিক্ষণ একা থাকার সুযোগই কম। বাসায় যে সময়টা কাটাই…নিজের মত নিভৃতে কাটাই…এবাদত করি…গাছপালার পরিচর্যা…সামান্য টিভি দেখা…পুরনো বন্ধুদের সাথে কথা বলে সময় কেটে যায়।
দেশে তেমন কেউ নেই আপনজন। অধিকাংশই মারা গেছেন। জ্ঞাতি-গোষ্ঠী যারা আছে তাঁদের কাছে গিয়ে বড় জোর সপ্তাহখানেক থাকা যায়। এর বেশি নয়।

-সম্পূর্ণ একা একটা বাড়ি নিয়ে থাকার কি দরকার আপনার? বাড়িঘর পরিস্কার রাখাও তো বিরাট কাজ।

—তা ঠিক। যা পারি নিজে করি। বড় ছেলে এসে কিছু সাহায্য করে। সে তো কাছেই থাকে। মাসে একদিন একটি মেয়ে এসে ঘরদোর সাফ সুতরো করে যায়। রূপম মানে আমার বড় ছেলে এখনও চায় আমি ওর কাছেই থাকি। রূপমের বিয়ের পর পর কিছুদিন ছিলাম ওদের সাথে। সব ছেলেমেয়েরাই মায়ের রান্নার ভক্ত থাকে, রূপমও তার ব্যতিক্রম নয়। আমার হাতের লুচি, আলুর দম খেয়ে রূপম এত উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছিল যে ওর বউয়ের মুখ ভার হয়ে গেল। রূপম লক্ষ্য না করলেও আমি দেখেছিলাম। এরপর থেকে রাইমা আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করলো। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সন্তানদের সাথে সম্পর্ক ভাল রাখতে হলে ওদের ব্যক্তিগত জীবনে যত কম অনুপ্রবেশ করা যায় ততই মঙ্গল। এখন যাই, দু’চারদিন থাকি…রাইমা আগে থেকেই ঠিক করে রাখে রূপমের জন্য আমি কি কি রাঁধব। সে কটা দিন রান্না থেকে ওদের ছুটি।

আচ্ছা, চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। বস, আরেক কাপ চা নিয়ে আসি।

টুকটুক করে হেঁটে এই একাত্তর বছরের বৃদ্ধা কিচেনে গেলেন। ইলেকট্রিক কেটলিতে চায়ের পানি বসালেন। ধূমায়িত এক কাপ চা নিয়ে ফিরে এলেন। তাঁর প্রতিটি কাজ মার্জিত, রুচিশীল।
আমি অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছিলাম, এভাবে কতদিন চলবে? আন্টির আরও বয়স হবে…তখন!
আমার মনের কথা বুঝি টের পেলেন। নড়েচড়ে বসে বললেন,

–জানো, আমি চাই, কোনো ঝামেলা ছাড়াই যেন আমার মৃত্যু হয়। সারা জীবন কাউকে কখনো নিজের জন্য ডাকিনি…অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে ছেলেমেয়েরা নার্সিং হোমে পাঠিয়ে দেবে.. ইচ্ছে করে না ওখানে যেতে…অন্যের সেবা নেয়া …পরনির্ভরশীল হয়ে যাওয়া। বড্ড অপমানকর জীবন।

—কিন্তু আন্টি আপনি তো সন্তানদের কাছেও যেতে চান না।

—আরও অথর্ব হয়ে গেলে ওদের কাছেই বা কি করে থাকব? ওদের কি সময় আছে? এদেশে বুড়োদের জন্য সিনিয়রস হোম তো রয়েছেই। তোমার শ্বশুর- শাশুড়ির স্বাস্থ্য কেমন?
—ভাল, বেশ ভাল।

আন্টির কথায় মনে হল, পরাগ মাঝে মাঝে বিষণ্ণ হয়ে ভাবে, বাবা-মাকে যদি সিনিয়রস হোমে রাখতে হয় কিভাবে খরচ চালাবে!
আর আমি এই অদ্ভুত শান্তশিষ্ট, কোলাহল বিরোধী, শান্তিপ্রিয় মানুষটা মনে মনে ভাবি কবে তারা যাবেন হোমে…খুব স্বার্থপর ভাবনা কি?
ওঁরা নেই বলেই তো আজকের দিনটাতে আমি খোলা বাতাসে শ্বাস নিতে পারছি…নতুবা প্রতিদিন দমবন্ধ হয়ে ইটের নীচে চাপা পড়া ঘাসের মত একটু একটু করে মলিন থেকে মলিনতর হচ্ছি। এক ফোঁটা সূর্যালোকের জন্য প্রতিদিন কাজে ছুটে যাই…ঘরে ফিরে যাবার পর প্রতিটি পল যেন আবার বেঁচে থাকতে পারি সেই প্রত্যাশায়।

কিন্তু জাহিদা আন্টির মত সময় আমারও আসবে। সাহস না হারিয়ে এমনি করে দৃপ্ত পদে কি হেঁটে যেতে পারব সামনের পথটুকু?
আমাদের দেশে কেন মেয়েদের স্বনির্ভর হতে শেখান হয় না? স্বনির্ভর হবার পরেও আমরা কেন আশা করি সন্তান আমাকে দেখবে? এই পৃথিবীতে আমরা সবাই এসেছি একা…ফিরে যেতেও হবে একা…মধ্যকার জীবনটা শুধুই ছলনা আর মায়া!

বৈরি পথ মাড়িয়ে জীবন সায়াহ্নে এসে এই প্রবাসের শেকড়বিহীন জীবনে যতটা প্রফুল্ল থাকা যায়, নিজেকে ব্যস্ত রেখে সেই চেষ্টাই করছেন সামনে বসা এই বৃদ্ধা।
তাঁর কোন আফসোস নেই, অনুযোগ নেই, অভিশাপ নেই, হাহাকার নেই, বিমর্ষতা নেই।
স্বপ্নও নেই।

যদি সব ছেড়ে চলে যেতেই হয় তবে আর অত মায়া করেই বা কি হবে!
বিচিত্র এ জীবন, বিচিত্র মানুষের মন।

আন্টি তখনও বলে চলেছেন, “আমার কোন আফসোস নেই জানো ! প্রয়োজনের অতিরিক্ত সুখ, ভালবাসা আমি পেয়েছি। স্বামীর স্বচ্ছলতা আমাকে সাহস যুগিয়েছে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার। যতদিন সুস্থভাবে বাঁচি ততদিন মানুষের জন্য কিছু করে যেতে চাই। একাকীত্ব, নিসঃঙ্গতা আমাকে আর স্পর্শ করে না।
বেঁচে তো আছি। বেঁচে থাকাটাই আশীর্বাদ।”

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড. কে. নিপা

Post navigation