বিদেশী রূপকথাঃ চড়ুই, ইঁদুর ও বিড়ালের গল্প

তাবাসসুম নাজ
টরোন্টো, কানাডা।

বিদেশী রূপকথা: চড়ুই, ইঁদুর ও বিড়ালের গল্প

অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক বনে বাস করত তিন বন্ধু—চড়ুই, ইঁদুর আর বিড়াল। তিনজনে একসাথে এক বাসায় থাকত, সব কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। রোজ সকালে চড়ুই বের হয়ে যেত কাঠের খোঁজে, সারাদিন ঘুরে ঘুরে সবচেয়ে ভালো আর শুকনো জ্বালানী কাঠ নিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরত। ইঁদুরের কাজ ছিল কুয়া থেকে পানি আনা, ফায়ারপ্লেসে আগুন ধরানো আর টেবিল লাগানো। বিড়াল ছিল সবচেয়ে ঘরকুনো, ঘরে থাকতে তার বেশি ভালো লাগত, তাই তার ভাগে রান্নার ভারটা পড়েছিল।
তিনবন্ধু মিলে মহানন্দে দিন কাটাচ্ছিল। সারাদিন কাজের পর রাতের খাবার খেয়ে তিনবন্ধু ফায়ারপ্লেসের আগুনে তাপ নিতে নিতে বহু গল্প করত। তারপর রাত হলে নিজেদের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। পরদিন সকালে আবার কাজে বেড়িয়ে পড়ত।
একদিন চড়ুই কাঠের খোঁজে বের হয়েছে, রাস্তায় দেখা হল প্যাঁচার সাথে। প্যাঁচা প্যাঁচামুখ করে বলে—কি হে! খুব খুশি দেখি? কেমন আছ?
— খুব ভালো! এরচেয়ে ভালো থাকা যায় না।
— বটে! কিরকম শুনি?
সবশুনে প্যাঁচা মুখ কালো করে বলে—তুমি তো বলছ ভালো আছ। কিন্তু তোমার বন্ধুরা তোমাকে কেমন ঠকাচ্ছে ভেবে দেখেছ? তোমার তুলনায় ওদের কাজ কিছুই না।
চড়ুই তাড়াতাড়ি বলে—না, না, ওরাও অনেক কাজ করে।
—দূর, পানি আনা, আগুন জ্বালানো, রান্না করা আবার একটা কাজ নাকি? কতক্ষণ লাগে করতে? ওরা সারাদিন শুয়ে বসে থাকে আর তুমি খাটতেই থাক। তোমাকে বোকা পেয়ে ওরা খাটিয়ে নিচ্ছে!
শুনে চড়ুই এর খটকা লাগে। আসলেই তো, সে অনেক কাজ করে, তার বন্ধুদের থেকে বেশি তো বটেই!
সেরাতে খাবার পর যখন সবাই ফায়ারপ্লেসের সামনে বসেছে, তখন চড়ুই বলে—বিড়াল, ইঁদুর, আমার একটা কথা ছিল।
বিড়াল আর ইঁদুর দুজনেই লক্ষ্য করেছে যে তাদের বন্ধু আজ অনেক গম্ভীর, অন্যদিনের মত গল্প করছে না।
তারা দুজনে একসাথে বলে— কি কথা, চড়ুই?
—আমার আর কাঠ খোঁজাখুঁজি করতে ভালো লাগছে না। কাল থেকে তোমাদের একজন একাজে যাবে আর আমি তোমাদের দুজনের একজনের কাজ করব।
বিড়াল আর ইঁদুর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। ইঁদুর বলে—কিন্তু চড়ুই, আমাদের এই সিস্টেম তো খুব ভালোভাবে চলছে। এখন বদলাবদলি করা কি ঠিক হবে?
বিড়াল বলে—আমরা যে যার কাজ খুব ভালোভাবে পারি। কিন্তু অন্যের কাজ সম্বন্ধে তো কিছুই জানি না। তাই আদলবদল না করাই ভালো হবে কিন্তু।
চড়ুই এবারে রেগে যায়। বলে— তা তো বলবেই! আমার ঘাড়ে সব কাজ চাপিয়ে নিজেরা আরাম আয়েশ করছ! তোমরা তো একথা বলবেই!
চড়ুই এর কথা শুনে বিড়াল আর ইঁদুর খুব দুঃখ পায়। কী আর করা, মনে যখন একবার সন্দেহ ঢুকেছে তখন চড়ুই এর কথা মেনে নেওয়াই যাক!
পরদিন বিড়াল যায় কাঠ খোঁজার কাজে, চড়ুই নেয় পানি আনার দায়িত্ব আর ইঁদুর রান্নার দিকটা সামলায়। দিন পার হয়ে যায়, বিড়ালের দেখা নাই। হলটা কী? ইঁদুর আর চড়ুই চিন্তায় পড়ে গেল। শেষে চড়ুই বের হয় বিড়ালের খোঁজে। রাস্তায় দেখা হয় কুকুরের সাথে।
তাকে প্রশ্ন করে—বিড়ালকে দেখেছ?
—ঘেউ।
— ঘেউ কি? বিড়ালকে দেখেছ নাকি সেটা বল না!
—দেখেছি। তাকে কামড়ে মেরে ফেলেছি!
— কি বললে? খুনি! শয়তান! আমার বন্ধুকে কেন মারলে?
— ও, তোমার বন্ধু বুঝি। কেমন কেমন জানি চালচলন! আমি তো ভেবেছি স্পাই। তাই দিয়েছি শেষ করে।
মনখারাপ করে চড়ুই বাড়ি ফিরে। ইঁদুরকে সব খুলে বলে, বিড়ালের জন্য দুজনে মিলে কান্নাকাটি করে।
একসময় ইঁদুর বলে—যে গিয়েছে সে তো আর ফিরবে না। বিড়ালকে আমরা সবসময় মনে রাখব। সে আমাদের খুব ভালো বন্ধু ছিল।
ইঁদুর যায় রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু রান্না সে তো কখনো করেনি। তাই বুঝতে না পেরে হুলুস্থুল ধরনের বড় এক পাতিল সুপ বানিয়েছে। সেই সুপ বেড়ে নেবার জন্য উপুড় হতে নিজেই সুপের পাতিলে পড়ে যায়।
এদিকে চড়ুই কখনো ফায়ারপ্লেসে আগুন ধরায়নি। আনাড়ি হাতে আগুন জ্বালাতে গিয়ে কার্পেটে আগুন ধরিয়ে ফেলে। সেই আগুন নিভাতে দৌড়ে পানি আনতে যায় কুয়া থেকে। কিন্তু কুয়া থেকে পানি সে কখনো তোলেনি। তাই টাল সামলাতে না পেরে বালতির সাথে সেও কুয়ার মধ্যে পড়ে যায়।
যার কাজ তারেই সাজে
অন্যের মাথায় লাঠি বাজে।

অচিনপুর ডেস্ক/ এসএসববি

Post navigation