পিয়ালির কথা

অমিতা মজুমদার
পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা।

গল্পঃ পিয়ালির কথা

কখনো রাজারবাগ সিগন্যালে, কখনো মৌচাক সিগন্যালে, আবার কাকরাইল, শান্তিনগর, কারওয়ানবাজার সিগন্যালে ওদের দেখা যায়। পথচারিদের কাছে হাত পাতে। যে যা দেয় সন্তুষ্ট মনে নিয়ে যায়। আবার কখনো কখনো বিরূপ আচরণও করে। ওদেরই একজন পিয়ালি। হয়তো ওর বাবা মায়ের দেয়া নাম এটা নয়।
পিয়ালি নাম কে রেখেছে পিয়ালি তা বলতে পারেনি। হয়তো এই দলে মিশে যাওয়ার পরে কেউ দিয়েছিল। ওর ঝাপসা হয়ে যাওয়া স্মৃতিতে যা মনে আছে তাই বলে গিয়েছিল মাথা নীচু করে পা দিয়ে মাটিতে খোঁড়াখুঁড়ি করতে করতে।
তার শৈশব আর পাঁচটা বাঙালী মেয়ের মতোই ছিল। ঘরে বাবা-মা বড় এক ভাই আর ছোট এক বোন। বাবা সরকারি চাকুরি করে মা গৃহিনী। সেই চিরাচরিত পরিচয়। বেশ কাটছিল সরকারি কলোনীর জীবন। খালি মা কেন যেন বাবার কাছে বেশি যেতে দিতে চাইত না। চাইত না বাইরেও বেশি যেতে দিতে। স্কুলে যাওয়ার সময় বারবার বলে দিত বাথরুমে যেন একা যাই। স্কুলে যেন কারো সাথে বেশি না মেলামেশা করি। তখন কিছুই বুঝত না। ছোট বোনটা জন্মানোর পর পরই সব কেমন বদলে গেল। মা তাকে সবসময় বাবার কাছে যেতে দেয়, পাড়ায় সব বাসায় তাকে নিয়ে যায়। পিয়ালির কেমন একটা কষ্ট হয় মায়ের এই আচরণে। কারণে অকারণে মা তাকে মারে, বকে।এভাবেই আরো বছর দুয়েক কেটে গেল। এখন পিয়ালি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। স্কুল থেকে সবাইকে নিয়ে কাছে পিঠে কোথাও একটা যাওয়া হবে। মাকে এসে বলতেই মায়ের সাফ কথা, তোমার কোথাও যাওয়া হবে না। ফাইভ পর্যন্ত পড়েছ এই যথেষ্ট। এখন থেকে ঘরের কাজে মন দাও। পিয়ালি অবাক হয়ে যায় মাঝে মাঝে, এই মা অন্য সকলের সাথে কতো হাসিখুশী থাকে। তার সাথেই সবসময় রাগ করে কথা বলে। আজকাল তো ঠিকমতো খেতেও দেয় না। সবার সাথে বসতেও বারণ করেছে।
হঠাৎ একদিন মা বাবাকে বলল- অনেকদিন দেশের বাড়ি যাই না, চলেন দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। বাবা বলল- আমিতো এখন ছুটি পাবোনা, তুমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘুরে আসো। বাসের টিকেট কেটে দেই।মা বলল-ঠিক আছে, আগামী শুক্রবারে আমাদের বাসে তুলে দিয়েন। সোহেল আমার ভাই সে বলল- আমি বাবার সাথে থাকব। এখন বাড়ি যাবো না। বাবা যখন যাবে তখন যাবো।
মা তাতেই রাজী হয়ে গেলেন কেন যেন। এমনিতে মা সোহেল ভাইকে চোখে হারায়। একমাত্র ছেলে বলে কথা।
পরের শুক্রবারে সকালবেলা বাবা তাদের গাবতলিতে গিয়ে বাসে তুলে দিল। বলে দিল আরিচা ফেরিতে তোমরা বাস থেকে নেমো না। দুজন ছোট মানুষ নিয়ে যাচ্ছ, অত বাসের ভীড়ে কে কোথায় আবার হারিয়ে না যাও। আরিচা অবধি যেতে মা আমার সাথে তেমন কথা বললো না। কেমন গম্ভীর মুখে বাইরেটা দেখছিল। বোন দুএকবার এটা সেটা বললেও মা কেমন চুপচাপ ছিল। আরিচার কাছে আসতে আসতে মা আমাকে বিশটা টাকা দিলেন। আমি মায়ের মুখের দিকে চাইলে মা কেমন একটা মলিন হাসি দিল। তারপর যা করল তা এর আগে কখনো করেছে বলে আমার মনে নেই। মা আমাকে আদর করে কাছে টেনে নিল,গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। একটা চুমুও দিল। আমি কেমন ফ্যালফ্যাল করে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। বাস ফেরিতে ওঠার সাথে সাথে মা বলল-আমার একটু বাথরুম পেয়েছে।তুমি থাকো আমি বাথরুম সেরে আসি।
এই বলে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বোনকে কোলে নিয়ে মা কেমন দৌড়ে নেমে গেল। অনেক সময় কেটে যাওয়ার পরেও মা আর এলো না। ফেরিতে কতো বাস আমি কোথায় মাকে খুঁজব? মা বলেছে সব মালপত্র দেখে রাখতে। তাই চুপ করে বসে থাকলাম। তারপরে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম থেকে যখন জাগলাম দেখি একটা লোক আমাকে কেমন করে দেখছে। বলল-খুকি তুমি কোথায় যাবে? বাসের সবাইতো নেমে গেছে অনেক আগে। বাস নিয়ে আমরা ডিপোতে এসেছি পরিষ্কার করব বলে।
এর মধ্যে আরো তিনচারটা লোক বাসে উঠে পড়ল।লোকগুলো সব কেমন করে যেন আমাকে দেখছিল। হঠাৎ একটা লোক এসে আমার পরণের প্যান্টটা টান মেরে খুলে ফেলল। আর তারপর সবাই মিলে খুব হাসতে লাগল। আমি কিছু বুঝতেই পারছিলাম না।
একজন বলে উঠল- আরে হিজড়া এজন্যই মাবাপে ইচ্ছা কইরাই বাসে ফ্যালাইয়া রাইখ্যা গেছে। ভদ্দর লোকেরতো আবার সন্তান হিজড়া অইলে মানে লাগে।
সেই শুরু এক অন্যজীবনের। কয়েক মাস ঐ বাসের হেলপার, কন্ডাক্টরদের সাথেই থাকি। ছেলেদের জামা পড়ি। উসকো খুশকো চুল রোদে পুড়ে গায়ের রঙ তামাটে হয়ে উঠেছে।
এভাবেই একদিন বাসে ওঠে একদল অবমানব। যারা সবাই এক অদ্ভুত সাজপোশাকে নিজেদের আলাদা জাত চিনিয়ে দিচ্ছিল সবাইকে। কথা বলছিল নিজেদের মধ্যে। কিছুটা কর্কশ গলার স্বর তাদের। তবুও কেমন যেন আপন আপন লাগছিল। একটা ষ্টেশনে যখন তারা নেমে যাচ্ছিল আমিও তাদের পিছুপিছু নেমে পড়লাম।
কখন তাদের দলে মিশে গিয়েছি জানি না। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। এখন আমি পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্ত একজন মানুষ না অবমানব।
আমার কোন জাত নেই,ধর্ম নেই, লিঙ্গ নেই। আর এই নেইগুলো আমায় ঘিরে রেখেছে বলে আমার কোন অধিকারও নেই।
আমাকে কেউ ভালোবাসেনা, আমারও কাউকে ভালোবাসার অধিকার নেই।
অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আশ্রয় বলে যে মৌলিক অধিকার থাকে একটি জীবিত জীবনের, আমাদের তাও নেই।

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড. কে. নিপা

Post navigation