পাগল পাগল মেয়েটা আর দুষ্টু দুষ্টু ছেলেটা

আসিফ রহমান জয়
মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

গল্পঃ পাগল পাগল মেয়েটা আর দুষ্টু দুষ্টু ছেলেটা

-আচ্ছা, তোমাকে একটা বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রশ্ন করি?

মেয়েটা কাঁচা আম ভর্তা খাচ্ছিলো। খাওয়ার মাঝেই থমকে গেলো, বড় বড় চোখে ছেলেটার দিকে তাকালো।
-বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রশ্ন আবার কি? উপস্থিত বুদ্ধি নাকি? উপস্থিত বুদ্ধি হলে পারবো না। আমার উপস্থিত বুদ্ধি নাই। আমার হলো ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’-টাইপ বুদ্ধি। আমি কারো সাথে ঝগড়া করতে পারি না। লোকজন আমাকে একগাদা কথা শুনিয়ে চলে যায়, চলে গেলে তখন আমার মাথায় আসে, আরে আমি তো এটা বলতে পারতাম, সেটা বলতে পারতাম, কিন্তু কিছুই তো বলতে পারলাম না। বুঝলে? তবে বিসিএস এর বুদ্ধিবিষয়ক প্রশ্ন হলে পারতেও পারি। বিসিএস এর গাইড অনেকটা মুখস্থ আছে।

ছেলেটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সব সুন্দরী মেয়েরাই কি বেশী কথা বলে? এই মেয়েটা তাদের বিল্ডিঙের পাঁচতলায় থাকে-বি5, ইউনিভার্সিটি ফাইনাল ইয়ার। গত দুই বছর ধরে তাদের মধ্যে বেশ সুন্দর-রোমান্টিক একটা সম্পর্ক চলছে। যদিও কেউ কাউকে এপ্রোচ করেনি, কেউ কিছুই বলেনি। দুজনেরই ধারনা সম্পর্কটা হয়তো ঠিক ভালোবাসার না। হয়তো বন্ধুত্বের চাইতে কিছুটা বেশী, আবার ভালোবাসার চাইতে কিছুটা কম। সম্পর্কের গাণিতিক মডেলটা অনেকটা এইরকমঃ
=>বন্ধুত্ব < “সম্পর্ক” < ভালোবাসা

ছেলেটা ঠিক করেছে যে, আজকে ব্যাপারটার একটা ফয়সালা হওয়া দরকার। দুই বছর কম সময় না। এতোদিনে না বুঝলে কবে বুঝবে? ছেলেটার দৃঢ় বিশ্বাস যে, সে মেয়েটাকে ভালোবাসে। মেয়েটাও ভালোবাসে কিন্তু সে খুবই কনফিউজড। এইজন্যই সে এই বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রশ্ন করার প্লান করেছে। ওরা উত্তরার ১৩ নাম্বার লেকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শহরে তালপাকা রোদ পড়েছে, সেই সাথে ভ্যাপসা গরম। এই গরমে আম-মাখা খেতে ভালো লাগছে।

-সহজ প্রশ্ন। তোমাদের বাসাটা পাঁচ তলায়। আমরা তিনতলায় থাকি। পাঁচ তলা থেকে তিন তলায় নামতে বেশী সময় লাগে? নাকি একতলা থেকে তিনতলায় উঠতে বেশী সময় লাগে? মেয়েটা প্রশ্ন শুনে বেশ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।

-এর মধ্যে বুদ্ধির খেলা কোথায়? এর মধ্যে বরং কিছুটা সায়েন্স আছে। পাঁচতলা থেকে নামার সময় গ্রাভিটি হেল্প করবে, তুমি দ্রুত নামতে পারবে। একতলা থেকে তিনতলায় উঠতে ঠিক উল্টো ব্যাপার হবে, কষ্ট হবে, সময়ও বেশী লাগবে।

-আরে তুমি সায়েন্সও জানো নাকি? তুমি না আর্টসের ছাত্রী? -কি মুশকিল… আর্টসের ছাত্রী বলে, এটুকু জানবো না?

-গুড। তাহলে এক কাজ করো। যেহেতু পাঁচ তলা থেকে নামতে সময় কম লাগবে, এখন থেকে আমার রুমের এক কপি চাবি তোমাকে দিয়ে দিলাম। তোমার জন্য আসা-যাওয়া করা সহজ হবে। মেয়েটা ভীষন অবাক হলো! এ কি কথা! কিসের মধ্যে কি?

-মানে কি? পাঁচতলা থেকে নামা সহজ বলে, তোমার রুমের চাবি আমাকে দিয়ে দিলে? আমি তোমার রুমের চাবি নিয়ে কি করব? ছেলেটা একটু ইতস্ততঃ করে বলল- -ইয়ে মানে… বেশ কিছুদিন ধরে, আমাদের ছুটা বুয়াটা আসছে না। আমাদের বাসার নিয়ম হলো, যার যার রুম সে সে পরিস্কার করে। আম্মা আমার রুমে ঢুকতে পারে না, এতো নোংরা হয়ে আছে। সেদিন বলল, আমি তোর রুম পরিস্কার করতে পারবো না। তুই লোক খুঁজে নিয়ে আয়। মেয়েটা এবারে রেগে গেল। রেগে গেলে সে তুই-তোকারী শুরু করে দেয়।

-কি? তোর রুম পরিস্কার করতে তুই বুয়া পাচ্ছিস না। তাই আমাকে চাবি দিয়ে দিচ্ছিস যাতে করে… এই পর্যন্ত বলে রাগী মেয়েটা কেমন যেন থতমত খেয়ে যায়! এতোক্ষণে চাবি দেয়ার মানেটা হয়তো বুঝতে পারে। ছেলেটা এই সুযোগে ব্যাগ থেকে ফুল বের করে, টকটকে লাল গোলাপ। মেয়েটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে- -সবাই তো প্রপোজ করার সময় ফুল দেয়। আমি ফুল আর আমার রুমের চাবিটা তোমাকে দিলাম। বাকীটা আম্মা-আব্বার সাথে তুমি ম্যানেজ করে নিও। তারা তোমাকে খুব পছন্দ করে। ফুল একসময় শুকিয়ে যাবে, চাবি কিন্তু সহজে ভাংবে না। এখন বল, উইল ইউ বি উইথ মি? প্লিজ? মেয়েটা হাসবে না কাঁদবে ভেবে পাচ্ছে না। এই ছেলেটাকে সে অনেক পছন্দ করে কিন্তু কিছুতেই মন ঠিক করতে পারছিল না। খুশীতে মেয়েটার চোখে প্রায় পানি চলে এসেছে, এভাবে কেউ প্রপোজ করে? সে ঠিক করল যে, কিছুতেই তার চোখের পানি ছেলেটাকে দেখাবে না। ছেলেমানুষ খুব পাজী হয়, এদের মাথায় ওঠাতে হয় না। মাথায় ওঠালেই এরা বাঁদরের মতো লাফালাফি শুরু করে। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই হাসি থামাতে পারছে না। তার খুব আনন্দ লাগছে! মেয়েটা হাসিমুখে মাথা দোলাল। ছেলেটার হাত থেকে ফুল আর চাবিটা নিল।

-অফকোর্স… আই উইল বি উইথ ইউ। এইভাবে কেউ প্রপোজ করে? ফুল আর চাবি দিয়ে? চাবি আর ফুলটা সে ব্যাগের মধ্যে ঢোকাল। তারপর হঠাৎই তার মাথায় একটা চিন্তা এল। সে ছেলেটার দিকে ঝট করে ঘুরে সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করল- -‘তুমি আমাকে প্রপোজ করবে, বুঝলাম। চাবি দিয়ে দিলে, সেটাও বুঝলাম। কিন্তু একতলা থেকে তিনতলা কম সময় লাগে, নাকি পাঁচতলা থেকে তিনতলা কম সময় লাগে-এইটা কেন জিজ্ঞাসা করলে? ছেলেটা বাঁদরামি মার্কা হাসি হেসে বলল- -‘তুমি চাবি না নিলে একতলার সোহানাকে বলতাম। ঐ যে, সুন্দর মতো মেয়েটা, চোখগুলো বড় বড়… ’ ছেলেটা এই পর্যন্তই বলার সময় পেলো, মুখের কথা আর শেষ করতে পারল না। মেয়েটা ততোক্ষণে ছেলেটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দুহাতে সমানে কিল-ঘুষি চলছে। ছেলেটার কিন্তু একফোঁটাও ব্যথা লাগছে না। সে হো হো করে হাসছে। ভালোবাসার কিল-ঘুষিতে মনে হয় ব্যথা লাগে না।

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড. কে. নিপা

Post navigation