পর্ব-৫: রুবাইয়াৎ মানে কাব্য যাদু

প্রচণ্ড মাতৃভক্ত ওমর, মা যতদিন বেঁচেছিলেন তাঁর সেবায় এতটুকু কম হতে দেননি। মায়ের সেবায় ব্যাঘাত হতে পারে, এ কারণে তিনি বিয়েও করেননি। নাযিমউদ্দিন রাযী তাঁর পুস্তকে স্বীকার করেন যতদিন মা বেঁচেছিলেন, ওমর ততদিন মদ্যপান কিংবা নারীসঙ্গ উপভোগ করেননি। 

ওমর খৈয়ামের যখন পিতা মারা যায় খৈয়াম তখন নিতান্ত শিশু। তাই এই শিশু পুত্রকে নিয়ে আরজুমান্দ (তার মাতা) পড়েন অকুল দরিয়ায়। পৈতৃক পেশা নকশি কারুকাজের পশরা সাজিয়ে লোকভুলানো ছড়া কবিতা দিয়ে লোকের মনোরঞ্জন করে তা দিয়েই সংগ্রামী জীবন টেনে নিতে থাকেন। এই হীন কাজের বিনিময়ে যা পেতেন, তাতেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন। ওমর খৈয়ামও পৈতৃক পেশায় না গিয়ে মায়ের এ গুণটি রপ্ত করেন। খৈয়ামের মাতার কিতাব পল্লীতে যাতায়াত ছিল কারণ ঐখানেই শিল্পের সমঝদার লোকদের আনাগোনা ছিল। কবিরা কবিতার বই প্রকাশের জন্য এসব নকশার খোঁজ করতেন এবং এসব নকশার ভেতর কবিতার পঙক্তি সাজাতেন। ধারণা করা হয়, ঐ কিতাব পট্টিতে খৈয়ামের মাতামহের কোন দোকান ছিল। শৈশবে খৈয়াম মাতামহের সাথে যাবতীয় কিতাব এ কারণে সাবাড়  করতে পেরেছিলেন। তাছাড়া অনেক বিজ্ঞানী ফিলোসফার এই পট্টিতে আসতেন। এখানেই হয়তো খৈয়ামের সাথে কোন ফিলোসফার পণ্ডিতের পরিচয় ঘটতে পারে, যা তাঁকে পরবর্তীতে বহুদূর যেতে সাহায্য করেছিল। খৈয়ামের মা এবং জন্ম পরিচয় নিয়ে বিশ্রী ইঙ্গিতবাহী একটি কিতাব রচিত হয় সমসাময়িক কালে নাম ‘মারসাদুল ইবাদ’ লিখেছিলেন নাযিমউদ্দিন রাযী। পুরোটাই গীবতের পুস্তক হলেও খৈয়াম সম্পর্কে জানার জন্য এটা একটা অমূল্য দলিল বলে রায় দিয়েছেন খৈয়াম গবেষকরা। বাকী সব কিতাবে যখন খৈয়ামকে ফেরেশতাতুল্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে এই কিতাবে খৈয়ামের নামে তাঁর মায়ের নামে হেন কুৎসা নেই যা রচনা হয়নি।

ওমর খৈয়ামের জীবনের অনেক দিকই আমাদের অজানা। তার অনেক কাজও দুর্ভাগ্যজনকভাবে হারিয়ে গিয়েছে কালের স্রোতে। তার দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা হয়, তিনি বিয়ে করেছিলেন এবং তার একটি সন্তানও ছিল। ১১৩১ সালের ৪ ডিসেম্বর ওমর খৈয়াম তার জন্মস্থান নিশাপুরে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মৃত্যুর আগে এমন একটি বাগানে তাকে সমাহিত করার কথা বলে গিয়েছিলেন, যেখানে বছরে দু’বার ফুল ফোটে। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়েছিল। দীর্ঘকাল তার কবরের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ১৯৬৩ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে তার কবর খুঁজে পাওয়া যায় এবং তা নিশাপুরে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে সে স্থানটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

ওমর খৈয়ামের রুবাইগুলো বিবেচনায় নির্ণয় করা এক রকম দুঃসাধ্য যে, তাঁর সত্যিকার মতাদর্শ কি! তিনি মূলত পার্থিব-সমাজ ও মানস-কাঠামো নির্ণয়ের জন্যে নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। চতুষ্পদীগুলির মধ্যে কোথাও তিনি আশাবাদে উজ্জ্বল, কোথাও আবার নৈরাশ্যবাদে বিবর্ণ। কখনও তিনি অদৃষ্টবাদে উৎকণ্ঠিত আবার তার পরেই অজ্ঞেয়বাদে বিব্রত। কোথাও তিনি তপস্যাবাদে মন্ত্রণামুখর, কোথাও আবার ভক্তিবাদে গদগদ কণ্ঠ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিহাস প্রিয়তায় তিনি লঘুপদ।

ওমর সুফীদের মরমীবাদ প্রচার করতে চেয়েছেন, না এপিকিউরিয় দর্শন অনুসারে দেহবাদের পক্ষে ওকালতি করেছেন? না কি দার্শনিক জেনোর মতানুসারে সুখ-দুঃখে নিরাসক্তি সম্বন্ধেই তাঁর পক্ষপাতিত্ব? এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী তর্কের যুক্তি জমে উঠেছে বেশ, শুধু দৃঢ়ভাবে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। সে চেষ্টার কোনো আবশ্যকতা আছে বলেও মনে হয় না। মূলত ওমর কাব্যের যাঁরা পাঠক, তাঁরা কাব্যের রসাস্বাদন করতে করতে কবির মতাদর্শ ঠিক করবেন সেটাই বাঞ্ছনীয়।

রূপ-রস-আলো-গন্ধময় জগতে প্রাণ বারবার ফিরে আসতে চায়। কিন্তু মন জানে, কোনদিনও সে ফিরে আসতে পারবে না। তাই প্রাণ, স্মৃতির রেশটুকু ধরে রাখতে চায়। কিন্তু প্রাণের যদি একেবারেই বিলুপ্তি ঘটে, তবে স্মৃতির অস্তিত্ব থাকবে কোথায়? তাই ওমরের মনে এই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হয়েছে, ‘কেন জন্মে আবার মরতে হয়?’

জীবনের কোন সদুত্তর খুঁজে পাননি ওমর খৈয়াম। বিশ্বের কোন নিয়ম-নীতি খুঁজে না পেয়ে তিনি বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন, ধর্ম-সমাজ-ন্যায়-নীতি সকল কিছু নিয়ে উপহাস ও বিদ্রুপ করেছেন। কবির প্রশ্ন জাগে স্বর্গে শ্রেষ্ঠ মদের প্রতিশ্রুতি খোদা নিজেই দিয়েছেন, তবে ধরায় কেন তা পান করা যাবে না- ‘স্বর্গে পাব শরাব-সুধা এ যে কড়ার খোদ খোদার, ধরায় তাহা পান করলে পাপ হয় এ কোন বিচার?’ (রুবাই’ – ৫৩) কবির যুক্তি, মানুষ পাপ না করলে তবে খোদার দয়ালু স্বত্তা ব্যর্থ হবে। 

কবি নিজেকে বিবেচনা করেছেন এক সংকটময় মানুষ হিসেবে। মসজিদে যে অযোগ্য, গির্জার শত্রু। তার স্বর্গের আশা নেই, মর্ত্যেও শান্তি নেই। ‘এক হাতে মোর তসবী খোদার, আর হাতে মোর লাল গেলাস, অর্ধেক মোর পূণ্য স্নাত, অর্ধেক পাপে করল গ্রাস। পুরোপুরি কাফের নহি, নহে খাঁটি মুসলিমও – করুণ চোখে হেরে আমায় তাই ফিরোজা নীল আকাশ। (রুবাই’ – ৫০) কবির মন্তব্য স্বর্গ ছেড়ে মর্ত্যে আসার ব্যাপারে স্রষ্টা তাঁর মত নিলে তিনি কিছুতেই আসতেন না। সম্ভব হলে আসা যাওয়ার রীতিটাই বন্ধ করে দিত। ‘স্রষ্টা যদি মত্ নিতো মোরা আসতাম না প্রাণান্তেও, এই ধরাতে এসে আবার যাবার ইচ্ছে নেই মোটেও।’

অসাধারণ জ্ঞানী ওমর খৈয়াম জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতের অনেক কঠিন রহস্য বা প্রশ্নের সমাধান দিয়ে গেলেও অনেক অজানা বা রহস্যময় বিষয়গুলোর সমাধান জানতে না পারায় আক্ষেপ করে গেছেন। তাই তিনি জীবন এবং জগতের ও পারলৌকিক জীবনের রহস্য বা দর্শন সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এসব প্রশ্ন শুধু তার মনেই নয়, যুগে যুগে জ্ঞান-তৃষ্ণার্ত বা অনুসন্ধানী মানুষের মনের প্রশান্ত মহাসাগরেও তুলেছে অশান্ত ঝড়। দার্শনিকরা এ ধরনের প্রশ্নই উত্থাপন করেছেন। দর্শনের যুক্তি দিয়ে অনেক কিছু বোঝানো সম্ভব হলেও তারও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। দর্শন বা বিজ্ঞান দিয়ে যে ভাব তুলে ধরা যায় না খৈয়াম তা কবিতার অবয়বে তুলে ধরতে চেয়েছেন। আর তাই যুক্তি ও আবেগের করুণ রসের প্রভাবে ওমর খৈয়ামের চার-লাইন বিশিষ্ট রুবাইগুলো কবিতা জগতে হয়ে উঠেছে অনন্য।

শেষ করছি মহান আল্লাহর দয়া সম্পর্কে ওমর খৈয়মের প্রার্থনা সূচক রুবাই’ দিয়ে,

দয়া যদি কৃপা তব সত্য যদি তুমি দয়াবান
কেন তবে তব স্বর্গে পাপী কভু নাহি পায় স্থান?
পাপীদেরই দয়া করা সেই তো দয়ার পরিচয় 
পূণ্যফলে দয়া লাভ সে তো ঠিক দয়া তব নয়।

আরিফুর রহমান (সম্পাদক, অচিনপুর.কম)

…::::: সমাপ্তি :::::…

Post navigation