পর্ব:৩ – রুবাইয়াৎ মানে কাব্য যাদু

পৃথিবীর ইতিহাসে অনাবিষ্কৃত ওমর খৈয়ামের কাব্যকে ১৮৫৯ সালে এডওয়ার্ড ফিটসজেরাল্ড অনেকটাই আকস্মিকভাবে হাজির করেন পৃথিবীর দরবারে। ‘রুবাই’ মূলত খৈয়ামের মহা-আলোকিত ভুবনের ক্ষুদ্র একটি শাখা। আর এই ক্ষুদ্র শাখাতেই এখনও হাবুডুবু খাচ্ছে দুনিয়ার সব নামজাদা কবি সাহিত্যিকরা। অনেকের ধারণা, তাঁর কাব্যাস্বাদন শেক্সপিয়ার এবং গ্যাটেকেও হার মানিয়েছে। তার কারণ হল প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মিল, এবং ইংরেজি কাব্যস্নাত হয়ে যাওয়াতে বিশ্বের দুয়ারে খুব সহজে এর রস প্লাবিত হয়েছে। অধ্যাপক এ জে আরবেরির মতে পৃথিবীর শিক্ষিত লোকমাত্রই খৈয়ামকে জানে, অন্তত একটি কবিতা তাঁদের কাছে পৌঁছে গেছে তা হল-
“A jug of wine, a book of verse and thou.”

খৈয়ামের রুবাইয়াতের ভাষা, প্রকাশভঙ্গি ছিল অত্যন্ত সরল ও নৈসর্গিক৷ অদৃষ্টের প্রতি নিরাসক্তি, স্বর্গের প্রতি অনাস্থা, ভবিষতের প্রতি অনীহা, অতীতের মোহ-ত্যাগ, প্রভুর নির্বিকার অবিচার, মৃত্যুর প্রতি চিরবিশ্বাস আর সামগ্রিকভাবে বর্তমানকে উদযাপনই ছিল তার রুবাইয়াতের প্রাণশক্তি। তাই তার অনুবাদগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তিবিশেষে স্থান করে নিয়ে বিশেষ থেকে অসামান্যে প্রত্যাবর্তন করেছে বিভিন্ন রূপ আর আঙ্গিকে। কোন কবিই পারেনি তাকে নিয়মের ছকে বাধতে, বরং অন্তর্নিঃসৃত বাণী ভাস্বর হয়েছে সকল অনুবাদে।

বাংলা ভাষায় ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী নজরুল ইসলাম, কান্তিচন্দ্র ঘোষ, নরেন্দ্র দেব সহ অনেকেই অনুবাদ করেছেন। তার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম, নরেন্দ্র দেব ও কান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদ বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। এরমধ্যে কান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদের বিশেষত্ব হল ভাষার সরলতা, বিশেষ ছন্দের বহুল ব্যবহার, শব্দচয়নে নৈপন্য এবং ভাবের একত্রিকরণ। আর এ সব কারণে কান্তিচন্দ্রের অনুবাদ সাধারনের কাছে বেশী গ্রহণযোগ্য।

“Tis all a Chequer-board of Nights and Days
Where Destiny with Men for Pieces plays
Hither and thither moves, and mates, and slays,
And one by one back in the Closet lays.”

এর অনুবাদ কান্তিচন্দ্র ঘোষ করলেন,
“ছকটি আঁকা সৃজন ঘরের রাত্রী দিবা দুই রঙের
নিয়ৎ দেবী খেলছে পাশা মানুষ ঘুঁটি সব ঢঙের
পড়ছে পাশা ধ’রছে পুনঃ, কাটছে ঘুঁটি, উঠছে ফের
বাক্সবন্দী সব পুনরায়, সাঙ্গ হ’লে খেলার জের ৷”

কাজী নজরুল ইসলাম পূর্ণ দক্ষতা, রুচিবোধ ও নিজস্ব শৈল্পিক আঙ্গিকে ‘রুবাইয়াতে খৈয়াম’কে বাংলাদেশের সমাজে উপস্থাপন করতে সক্ষম ও সফল হয়েছেন। ‘রুবাইয়াতে খৈয়াম’ এর বিষয়বস্তু ও বৈশিষ্ট্য ওমর খৈয়াম কবিতার কাঠামো বা শব্দ চয়ন ও পরিভাষা ব্যবহারে কিংবা কাব্যভাবনায় অন্য কোন কবিকে অনুসরণ করেন নি। কেননা, তাঁর কাব্যরীতি সম্পূর্ণ আলাদা। যখন ‘খৈয়াম আদর্শ’ বলা হয় তখন তাঁর কাব্যভাবনাকেই বুঝানো হয়। তিনি কেবল সংক্ষিপ্ততার কাব্যালঙ্কার ব্যবহার করেছেন। তাঁর কবিতার ভাবধারা দার্শনিক। তাও আংশিক ও বাস্তবানুগ। যা সহজে শ্রোতার উপর প্রভাব বিস্তার করে। ফেরদৌসির মতো তাঁর ভাষার বৈশিষ্ট্য ছিল ফারসির প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ। নেহাত প্রয়োজনে আরবি শব্দ ব্যবহার করেছেন।

নজরুল ইসলাম রুবাইয়াতে ওমর খৈয়ামকে ছয় ভাগে ভাগ করেন। ১) অভিযোগ (যুগের নানা চালচিত্রের প্রতি অভিযোগ), ২) নিন্দামূলক, ৩) বিরহ, ৪) বাসন্তি, ৫) ধর্মহীনতা, ৬) মুনাজাত (প্রার্থনা)। তিনি রুবাইয়াত অনুবাদে মূল ফারসির সাহায্য নিয়েছেন।

আরিফুর রহমান (সম্পাদক, অচিনপুর.কম)

…….:::::::: চলবে :::::::……..

Post navigation