পর্ব:২ – রুবাইয়াৎ মানেই কাব্য যাদু

ওমর খৈয়াম ছিলেন একজন জগদ্বিখ্যাত কিংবদন্তী। প্রাচ্যের পারস্য-মনিষী ওমর খৈয়ামের মনন-মেধা আপন স্বকীয়তায় প্রোজ্জ্বল হয়েছে। জ্ঞানের যতগুলো শাখা আছে, তিনি ছোঁয়া দিয়েছেন প্রায় সব শাখাতেই। প্রতিটি শাখাকেই সমৃদ্ধ করে তিনি জ্ঞান পিপাসুদের করেছেন ঋদ্ধ। বীজ গণিতের আবিষ্কারক, প্রথম সৌর পঞ্জিকার আবিষ্কারক এই বিজ্ঞানী ছিলেন একজন জ্যোতির্বিদ। তিনিই প্রথম পারস্যে মান মন্দির স্থাপন করেন এবং অনেক গ্রহ নক্ষত্র আবিস্কার করেছিলেন।

গিয়াস উদ্দিন আবুল ফাতাহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল খৈয়াম

তিনি তার বিজ্ঞানের খোলস ছেড়ে কবে দার্শনিকতার স্তরে উপনীত হয়েছেন আর সীমাহীন প্রশ্ন জিজ্ঞাসায় রচনা করেছেন অমৃত সূধা স্বরুপ ‘রুবাইয়াৎ’, যার অস্তিত্বের রহস্যে এখনো পন্ডিতগণ একমত হননি। তার দর্শন উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে কালান্তরে; তার লক্ষণ মেলে আল্লামা ইকবালের পঙক্তি ও তার আসরারে খুদী’তে।
“এক তু হ্যায় কে হক হ্যায় ইস জাহাঁ মেঁ
বাকী হ্যায় নমুদ সিমিয়াই” – অর্থাৎ ‘এ দুনিয়ায়, হে মানুষ তুমিই একমাত্র সত্য, বাকী সবই মরীচিকা ‘।

অর্থহীন যে দুনিয়ায় মানুষ এক রাত্রির মুসাফির মাত্র, পারস্য-মনিষী ওমর সেথায় আনন্দে বিভোর হতে চেয়েছেন। তাইতো তিনি বলেছিলেন, ‘অনন্ত কাল ঘুমাবি কাল, পান করে নে মদ আজি।’
তিনি আরও বলেন, 
‘আজকে তোমার গোলাপ-বাগে ফুটল যখন রঙিন গুল 
রেখো না আর পান-পাত্র বেকার, উপচে পড়ক– সুখ ফজুল,
পান করে নে, সময় ভীষণ অবিশ্বাসী শত্রু ঘোর, 
হয়ত এমন ফুল মাখানো দিন পাবি না আজের তুল!’

ওমর খৈয়ম একজন সুফি দরবেশ হিসেবে যেমন সমাদৃত ছিলেন, তেমনি মৌলবাদ কর্তৃক নাস্তিক ঘোষিত হওয়া এবং তাঁদের হাতে জীবনের বিভিন্ন সময়ে নিগৃহীত হয়েছেন, রক্তাক্ত হয়েছেন, হয়েছিলেন চাকরীচ্যুত। এমনকি মৌলবাদীদের পরামর্শে শুদ্ধ হওয়ার জন্য হজ্ব ব্রত পালন করতে গিয়ে আরেকদল মৌলবাদী কর্তৃক মক্কা শরিফে লাঞ্ছিত হন এবং বিতাড়িত হন। ওমর খৈয়মের মতে, রক্ত চোষা শহরের মুফতির চেয়ে পানশালার মাতাল নিঃসন্দেহে উত্তম। আর তাই তিনি লিখেছিলেন,
‘হে শহরের মুফতি! তুমি বিপথগামী কম তো নও
পানোন্মত্ত আমার চেয়ে তুমিই বেশী বেহুঁশ হও
মানব-রক্ত শোষ তুমি, আমি শুষি আঙুর-খুন
রক্ত-পিপাসু কে বেশী এই দু’জনেরই, তুমিই কও!’ 

ওমরের মতে, এই মূঢ়ের দল অজ্ঞানতায় নিমজ্জ্বিত, তাই ফতোয়া দিয়ে তারা মুক্তবুদ্ধির ধারকদের কাফের বানিয়ে চলে। মূলত শুভ্র-মুক্তবুদ্ধির ধারক যারা, গর্দভ নয় তারা ওদের মতো। তাই কবির উপদেশ, আনাড়ির হাতের সুধার চেয়ে জ্ঞানীর হাতের গরল পিয়ে নেওয়া ভাল।

একজন কবি হিসেবে, একজন দার্শনিক হিসেবে বর্তমানে ওমর খৈয়াম বহুল আলোচিত। তাঁর কবিতার স্বাদ আস্বাদনকারী সমঝদারের সংখ্যা সম্ভবত পৃথিবীর যেকোনো কবির চেয়ে অনেক বেশী। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোন কাব্য এতো অল্প সময়ে এত অধিক জনপ্রিয়তার রেকর্ড গড়েনি। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন অঞ্চলে তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর চিন্তা-চেতনা-দর্শন।

আরিফুর রহমান (সম্পাদক, অচিনপুর.কম)

……….::: চলবে :::……….

Post navigation