পরিণয়(পর্ব-দুই)

ফাতেমা তুজ জোহরা
মেডিকেল কলেজ,কুষ্টিয়া।

ধারাবাহিকঃ পরিণয়(পর্ব-দুই)

“কিরে, তুই সেই যে বাড়িতে ঢুকলি,এরপর মোবাইল নিয়ে গুঁতোগুঁতি করছিস! একটু বাইরে গিয়ে বেড়িয়ে আসলেও তো পারিস।তাম্মিকেও নিয়ে যা তোর সাথে।”
“মা, মাফ কর, তোমার ফাজিল মেয়েকে নিয়ে আমি যাবোনা, এরচেয়ে মোবাইল এ হাওয়া খাওয়া ভালো। ”
“মা, দেখেছ, আমি ফাজিল, আর তুই কি রে!যা, গেলাম না তোর সাথে, আল্লাহ্‌ দুইটা পা আর চোখ দিছেন আমার, একাই যা তুই।”
“দেখেছ মা, কেমন বেয়াদব হচ্ছে, আমাকে তুইতোকারি করছে, তুমি বেশি আল্লাদ দিয়ে এই করেছ, এক কাজ কর মা, একে বিয়ে দিয়ে বিদেয় কর, হাহা।”
“উরে চান্দু, বিয়ে আমার না, হবে তোমার, আর সেইজন্য আমরা এখানে, বুঝলা; বিদেশ থেকে এত্ত বড় ডিগ্রী আনলেই বুদ্ধি হয়না।”
আমি হা হয়ে গেলাম, আসলেই কি!
“মা, এসব কি? মাত্র বাইরে থেকে আসলাম কদিন হল, একটু আরাম টারাম করি, আর তুমি…এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলো, আমি ঘুরে আসছি, এসে চা খাবো, ছোট মামা আসুক।আর নানা কোথায়, কথা শুনছি না।”
“তোর নানা মসজিদে, সেই মাগরিব পড়ে ফিরবে।”
“আচ্ছা, চল তাম্মি।”
“না, ভাইয়া তুই যা, আমার কাজ আছে।”
“ইহ! কাজ না ছাই, আচ্ছা তুই থাক।”


আহ! যতই দেশ বিদেশ ঘুরে আসো, এই ধুলো ভরা, মাটির পায়ে চলা পথ, আর শুকনো বাঁশ পাতা পায়ের নীচে নিয়ে শব্দ তুলে হেঁটে যেতে যে সুখ, সে কি আর কংক্রিট এর পথে আছে।পাঁচ বছর অনেককাল সময়।
নানার কথায় এসে ভালোই হল।
চারপাশে কেমন শান্তিময়, কিছু ছবি নিয়ে রাখতে হবে গ্রামের।
ঘুরতে ঘুরতে কখন যে এতো দূর এসেছি, সে খেয়াল নেই আমার।
এতো সুন্দর আর সবুজ চারপাশে, মনে হচ্ছে সবকিছুর ছবি তুলে নিই।ভাগ্যিস এখন ক্যামেরা বা মোবাইলে ফিল্ম সিস্টেম না।
বাপরে! এদিকটা এতো জংলা ঝোপঝাড়। সামনে এগিয়ে গেলাম।
ওয়াও! দারুণ তো।
বাঁশ ঝাড়ের নীচে সাদা বক, মোবাইল সাইলেন্ট করে ঝটপট ছবি নিলাম।
একটু কাছে আসতেই আমি থমকে গেলাম, এটা কি সত্য, হ্যাঁ,তাই তো।
এত সুন্দর কিছু আমি অনেককাল হয়তো দেখিনি, আর হয়তো দেখবো ও না।
যেন অন্য গ্রহের দৃশ্য, আমি নিঃশব্দে, কিছুটা কাছে গিয়ে ছবি তুলে নিলাম।”
কোথা থেকে মিষ্টি সুগন্ধ ভেসে আসছে, আমি চুপচাপ ফিরে আসলাম, কিন্তু মন পড়ে থাকলো পিছনে।

….
আর কদিন পর এক্সাম, ধুর,কত্ত পড়া বাকি, মাথায় নতুন চিন্তা বিয়ের, কোন মানে হয়!
ফুফি রাতের সব কাজ সেরে আমার রুমে।
“কিরে পড়া হচ্ছে?”
“আর পড়া, তোমরা যা শুরু করেছ।”
“এসব মাথায় না এনে পড়। আমি বসে দেখি,পড়া শেষ হলে গল্প করব কিছুক্ষন।”

“ফুফি, কি যেন বলবা?”
“আব্বা, বড় ভাইজান ছেলের বিষয়ে খবর নিয়েছে, ছেলে ভালো, মানে সুপাত্র হতে গেলে যে যে গুণ লাগে আরকি।”
“তাহলে আর কি! তা এই রাজপুত্র কোন সাত সমুদ্র পার হয়ে এসেছে?”
“কবির চাচা আছেনা, আব্বার বন্ধু,চাচার মেঝো মেয়ের ছেলে।আগামীকাল বিকেলবেলা ছেলে আসবে, তোর সাথে দেখা করবে, এখন তোর মতামত কি।তবে দেখা হলেই তো আর বিয়ে হয়না। বাকিটা তকদীর। ”
“হুম, সব বুঝলাম, তবে সাফ কথা আমার ভালো না লাগলে নো নেভার, এভার।”
“আচ্ছা, আয় এবার ঘুমিয়ে যাবি!”


বাড়ি ফিরে অস্থির লাগছে।
“মা, তাম্মিকে দিয়ে চা পাঠাই দাও।”
“তারিম, আগামীকাল তোকে এক জায়গায় যেতে হবে।”
“ভাইয়া, মেয়ে দেখতে যাবি, বুঝলি।”
“তুই চুপ থাক, এটা বড়দের ব্যাপার।মা, ইয়ে বলছিলাম, দুএকদিন দেরি করলে হয়না, একটা ঝামেলা হয়ে গেছে।”
“কিসের ঝামেলা? তোর কি পছন্দ আছে নাকি,তারিম?”
“ঠিক বুঝতে পারছি না, আছে না কি নাই।”
“ভাইয়া, তুই আসলেই… ”
“মা, বললাম তো একটা ঝামেলা হয়ে গেছে, খুব বিপদে আছি, আচ্ছা কাল জানাবো। ”


এখন কোথায় খুঁজে পাই তাকে!
এদিকে মা যা শুরু করেছে।
ভাগ্য কোথায় নিয়ে যায়, কে জানে।

এদিকে দিহান পরদিন বিকেলবেলা বসার রুমে গল্প করছে, মানে ছেলে আসবে সেই অপেক্ষা, দাদাভাই, বাবা, ফুফি, মা, দাদি সবাই।
দিহানের বিরক্ত লাগছে, আর কতক্ষণ!
মা, দাদি,দাদাভাই ভিতরে চলে গেল, বাবাও বাইরে কি যেন কাজে।
ফুফি আর আমি।
হুড়মুড় করে কে যেন রুমে আসলো, “আউচ!ধুর ছাই।”
আমি আর ফুপি অবাক,কে এলো।
“আপনি! আপনি এখানে কেন?” ধুর ছাই ব্যক্তির বিস্মিত বাক্য।
আমি আর ফুফি ততোধিক বিস্মিত।
“আমি এখানে মানে কি? আমি তো এখানেই থাকব, কিন্তু আপনি কে শুনি? অহ আপনি হলেন ধুর ছাই।”
ফুফি আমাকে পিছনদিক থেকে বলল,”আহ,দিহান,ফাজলামো করিস না।”
“ওহ,আপনি দিহান!আমার আপনার সাথে দেখা করার কথা ছিল।আমি,আমি আসলে ধুর ছাই,হাহা।আপনাদের ফুলের টবে প্রায় উষ্ঠা খেয়ে আমার পায়ের অবস্থা শোচনীয়। হাহা।”
ফুফি এক ফাঁকে গায়েব।
এখন আমাকে এই ধুর ছাই এর সাথে কথা বলতে হবে।
“আমি দিহান।সামনে আমার ফাইনাল এক্সাম,অনেক পড়তে হবে, আরে, ধুর ছাই, এসব কি বলছি।”আমি হেসে ফেললাম।
“হাহা, আপনিও।আমি তারিম।সরি আর কি বলব, বুঝতে পারছিনা।আসলে, আমি, মানে, আপনি,ধুর, কি বলি,আমি রাজি।”
“রাজি মানে কি?”
পিছন থেকে ফুফি কখন যেন রুমে,”তারিম,তুমি দাঁড়িয়ে কেন বস।নাস্তা কর।সবাই চলে আসবে।”
আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা, আমি কি বলবো। তারিম ফুফির সাথে গল্প করছে, আমি ভিতরবাড়ীতে চলে আসলাম।
ভাবতে হবে আমাকে, যাকে চিনিনা, হুট করে সিদ্ধান্ত, বেশ ঝামেলাই পড়া গেল দেখছি।

চলবে…

অচিনপুর/ জীনাতুল কুবরা নিপা

Post navigation