জোনাকির আলো

আফতাব হোসেন
লন্ডন, ইংল্যান্ড।

গল্প: জোনাকির আলো

আসসালাতু খায়রুম মিনান নাউম। কাছের, দূরের, অনেকগুলো মসজিদ হতে এক সাথে আজানের এই সুর ভেসে আসে। ঘুম হইতে নামাজ উত্তম। প্রতিদিনই এই শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ষোল ফুট বাই বারো ফুট একটা ঘরে, গত সাত দিন ধরে শুয়ে আছি। একা। ঠিক খুলনা শহরে নয়। একটু শহরতলীতে বাসা আমার। সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে হলেও কংক্রিটের দেয়ালগুলো এখানে এখনও গা ঘেঁষাঘেঁষি করে মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। বাড়িঘরের মাঝে মাঝে, এখানে, সেখানে এখনও অনেক গাছগাছালি। ওপর থেকে দেখলে বাড়িগুলোকে তাই সবুজের পটে আঁকা ছবির মতো মনে হয়।

আমার বাড়িটির সামনে অনেকখানি জায়গা ফাঁকা। সেখানেও নানা জাতের গাছ। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা। আছে গোটা তিনেক মাথা উঁচু মেহগনি গাছ। একপাশে বাড়ির বাউন্ডারি দেয়াল ঘেঁষে গুবাক তরুর সারি। অনেকটা নজরুলের সেই কবিতার মতো। তারই একটার পাতারা ছুঁয়ে থাকে আমার জানালার কার্নিশ। যখন বাতাস বয়, তখন সেই পাতাগুলো ঝালর দোলানো পাখার মত হাওয়া দেয়। আমার নিস্তেজ শরীরে ও মনে কী এক শিহরণ জাগে। কেমন শান্তির পরশ লাগে। জানালার গ্রিলের সাথে ওদের পাতার ঘর্ষণে এক ধরণের শব্দ হয়। যেন বলতে চাইছে, “ মুসাফির জাগো, নিশি আর নাই বাকী”। আমার শুকনা ঠোঁটে ম্লান হাসি ফোটে। আমিও বিড়বিড় করে বলি,

“চমকিয়া জাগি, ললাটে আমার কাহার নিশাস লাগে?

কে করে বীজন তপ্ত ললাটে, কে মোর শিয়রে জাগে?

জেগে দেখি, মোর বাতায়ন-পাশে জাগিছে স্বপনচারী

নিশীথ রাতের বন্ধু আমার গুবাক-তরুর সারি!

আজানের শব্দে গাছে গাছে ঘুমিয়ে থাকা পাখিরাও ডানা ঝাপটে জেগে ওঠে। কত সব নাম নাম না জানা সে পাখি। তাদের কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠে ভোরের বাতাস। একটা কোকিল অনবরত ডেকে চলে কুহু কুহু তানে। ওরাও কি এভাবে ঈশ্বর কিংবা প্রকৃতির বন্দনা করে? হয়ত! পাখিদের ভাষা আমি বুঝতে পারি না। তবে বড় ভালো লাগে এই সব পাখিদের কোলাহল। আহা, কত সুন্দর হয় এই পৃথিবী। আমার খুব ইচ্ছে করে, উঠি। উঠে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় অবনত হই।

কয়েক সপ্তাহ আগেও এমন সময় উঠে, ফ্রেস হয়ে, বন্ধুদের সাথে হাঁটতে বের হতাম। ঘণ্টা খানেক হেঁটে, পাড়ার মোড়ে বসে লাল চা আর বিস্কুট খেতে খেতে, জম্পেশ আড্ডায় মেতে উঠতাম। চায়ের কাপে ঝড় তুলে, রাজা উজির মেরে, দেশ ও জাতির কল্যাণ করে, যে যার ঘরে ফিরতাম।

কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল, সম্ভবত চেঙ্গিস খান, হালাকু খানদের জিন বহনকারী, এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী, যাকে খালি চোখে দেখাও যায় না, আক্রমণ করে বসল এই পৃথিবী। শক্তিতে, হিংস্রতায় সে ছাড়িয়ে গেল তার পূর্বসূরিদের। মাত্র তিন মাসে দখল করে নিয়েছে তারা প্রায় দুই শতাধিক দেশ। প্রবল আক্রোশে হত্যা করে চলেছে হাজার হাজার মানব সন্তান। চেঙ্গিস খান, হালাকু খানদের তাও দেখা যেত, এদের তো দেখাও যায় না। অদৃশ্য শত্রুর সাথে কী ভাবে যুজবে মানুষ? ভয়ে, আতংকে ঘরের ভেতর আশ্রয় নিয়েছে আজ সবাই। সামান্য একটা ভাইরাস সামাজিক জীব এই আমাদের পুরা অসামাজিক করে দিল। বাইরে যাওয়া যাবে না। এক সাথে হাঁটা যাবে না। কাউকে ছোঁয়া যাবে না। কারও বাসায় যাওয়া যাবে না। কেউ বাসায় আসতে পারবে না। করোনার কারণে মানবতা আজ হয়ে গেছে গৃহবন্দি!

সেই থেকে আর দল বেঁধে হাঁটার উপায় নেই। কার নিশ্বাসে লুকিয়ে আছে প্রাণঘাতী করোনা, কেউ জানে না। তবু আমি বাইরে বের হতাম। অদৃশ্য সেই শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে সুরক্ষা বর্মে নিজেকে আচ্ছাদিত করে বের হতাম। একা একাই হাঁটতাম। তবে শহরের দিকে যেতাম না। উলটো পথ ধরে, মাইল দেড়েক হাঁটলেই দক্ষিণ দেয়ানার বিল। সেই বিলে সারি সারি মাছের ঘের। সেই সব ঘেরের মাঝে মাটির আল। সরু মেঠো পথ। সে পথের দুধারে নানা রকম গাছ, ঝোপঝাড়। জনশ্রুতি আছে, আগে দিনে দুপুরেও এই বিলে মানুষ খুন করে পুতে রাখা হত। ভয়ে এ পথ কেউ ভুলেও পা মাড়াত না। এখন সে সব ভয় নেই। তবু জনশূন্য এ পথ। কখনও সখনও দু একজন কামলা টাইপের মানুষ দেখা যেত। করোনার ভয়ে তারাও আর আসে না এখানে। আমার কেন জানি কোনো ভয় কাজ করত না। বিলের মধ্যে এলেই আমি মুখের মাস্কটা নামিয়ে দিতাম। লম্বা টানে বুকে ভরে নিতাম বিলের নির্মল বাতাস। ঘাসের ডগায় জমা শিশির বিন্দুগুলো আমার পা ভিজিয়ে দিত। গাছের পাতারা আমার গায়ে মমতার আলতো পরশ বুলিয়ে দিত। আমি একা একা হাঁটতাম আর পাখিদের গান শুনতাম। নিজের সাথেই নিজে কথা বলতাম। ঘণ্টা দুয়েক প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে থেকে ফিরে আসতাম আপন ডেরায়। তারপর সারাদিন সেই বন্দি কারাগারে।
সপ্তা দুই আগের কথা। চৈত্রের সকালেও সেদিন ঘন কুয়াশা। দশ হাত দূরেও দেখা যায় না। কুয়াশা আমার খুব ভালো লাগে। বাতাসে কেমন এক ভেজা ভেজা স্পর্শ। আমি আনমনে হাঁটছি বিলের আল ধরে । দেখি পথের ধারেই একটা ঝোপে ফুটে আছে অনেক নাম না জানা নানা রঙের জংলী ফুল। আমার যে কী হয়, এক থোকা ফুল ছিঁড়ে হাতে নিই। প্রেয়সী সাথে থাকলে পরিয়ে দিতাম তার খোঁপায়। হঠাৎ এক কিন্নরী কিশোরী কণ্ঠ বলে ওঠে,

– এটা কী করলে?

শুনে চমকে উঠি আমি। দিনে দুপুরে যেখানে পুরুষ মানুষও আসে না, সেখানে, এই সাত সকালে, কিশোরী এল কোথা থেকে? ঘন কুয়াশার চাদরে তখনও ঢেকে আছে বিলের বুক, গাছের মাথা, ঝোপ ঝাড়ের মুখ। কেমন এক গা ছমছমে সুনসান নীরবতায় ডুবে আছে চারিদিক। আমি ভালো করে এদিক সেদিক দেখি। কেউ নেই। কিছু নেই। শুধু একটা কোকিল এই নৈশব্দের মাঝেও কণ্ঠে সেধে চলেছে এক বিরহের সুর। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম,

– কে? কে কথা কয়?

– আমি কাজল রাণী।

– কাজল রাণী? কোথায় তুমি? আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?

– আমাকে যে দিনের আলোয় দেখা যায় না ডাক্তার।

শুনে আমি এবার সত্যি সত্যি আমি ভয় পেয়ে গেলাম। দিনের আলোয় দেখা যায় না মানে কী ? আবার আমি যে ডাক্তার, তাও জানে দেখছি। বয়াতী বাড়ির পোলা আমি। ছেলেবেলায় বৈরাগী বাড়ির ভূতের দাবড়ের কথা এখনও স্মৃতিতে অম্লান। ভূত প্রেত নয় তো? আমার গায়ে কাঁটা দেয়। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইলাম,

– কী বলছ তুমি? দিনের আলোয় দেখা যাবে না কেন?

হঠাৎ রিনঝিন শব্দে হেসে ওঠে অদৃশ্য কিশোরী। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার মতো হাসতেই থাকে রিনিঝিনিয়ে। তার হাসিতে যেন গাছের পাতারাও দুলে দুলে ওঠে। কেঁপে কেঁপে ওঠে ঝোপ ঝাড়। অদৃশ্য করোনার ভয়ে আমার কি শ্রুতি বিভ্রম হচ্ছে? নাকি সত্যি সত্যি অশরীরী কেউ আছে এখানে? ছেলেবেলায় দেয়া কলিম বয়াতীর উপদেশ মনে পড়ে। এমন অবস্থায় একমাত্র করণীয়, ঘুরে ভোঁ দৌড়। যেই দৌড় দিতে যাব, অমনি শুনি,

– আমার ডাক্তার কি ভয় পেলে?

আমার ডাক্তার? কী শুনছি এ সব? আমার পা অবশ হয়ে যায়। দৌড় তো দূরের কথা, এক পা নড়ারও যেন শক্তি নেই আর। কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম,

– কেন এই বুড়ো মানুষটাকে মিছেমিছি ভয় দেখাচ্ছ ? যেই তুমি হও, আমার সামনে এসো।

– আমি তো তোমার সামনেই আছি।

– কেন হেয়ালী করছ? সামনে থাকলে আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন ?

– আরে বোকা, আমি তো জোনাকি পোকা। দিনের বেলায় আমাকে দেখবে কেমন করে ?

– যাহ, জোনাকিরা আবার কথা বলতে পারে নাকি?

– কেন পারবে না ? মানুষেরা কথা বলতে পারলে জোনাকিরা পারবে না কেন?

– তা পারে। কিন্তু পোকাদের কথা তো মানুষের বোঝার কথা নয়।

– তা ঠিক। তবে আমি চাইলে পারে।

– কেন? তুমি কি বিশেষ কেউ?

– তা বলতে পারো। আমি হলাম এই জোনাক রাজ্যের রাজকন্যা। সবাই আমাকে আদর করে কাজল রাণী বলে ডাকে।

শুনে আমার কেন জানি ভয় কেটে যায়। কাজল রাণী যেই হোক, জোনাক রাজ্যের রাজকন্যা কিংবা কোনো এক অশরীরী আত্মা, আমার ক্ষতি যে করবে না, তা বুঝে গেছি। হেসে জিজ্ঞেস করলাম,

– তা, কাজল রাণী, আমাকে থামালে কেন? আমি কি তোমার রাজ্যের কোনো ক্ষতি করেছি ?

– করেছই তো।

অনেকটা অভিমানী শোনায় কাজল রাণীর কণ্ঠ।

– আমি আবার কী ক্ষতি করলাম ?
-তোমার হাতের দিকে দেখ?

আমি আমার হাতের দিকে তাকাই। সে হাতে ধরা একটু আগে ছেড়া এক গুচ্ছ জংলী ফুল।

– তোমরা মানুষগুলো এমন কেন ? তোমাদের বাগানে ফোটে কত রংবেরংয়ের ফুল। কত তাদের ঘ্রাণ। সেই ফুল তুলে তোমরা ড্রইং রুমে ফুলদানীতে সাজিয়ে রাখো, প্রিয়ের খোঁপায় গুঁজে দাও, নেতাদের গলায় পড়িয়ে দাও, বাসর রাতে বিছানা সাজাও। এই নামহীন, গন্ধহীন ফুলগুলো না ছিঁড়লেই কি হত না? যে জীবন তোমরা দিতে পারো না, তা নিতে যাও কেন?

আমি আবার আমার হাতের দিকে তাকাই। এই অল্প সময়ের মধ্যেই কেমন নেতিয়ে পড়েছে ফুলগুলো। পথে যেতে যেতে একটু পরে হয়ত পথের ধুলায় ফেলে দিতাম এদের। অথচ গাছে থাকলে আরও কিছুদিন ফুটে থাকত অন্যদের মতো। আমি লজ্জা পেয়ে বলি,

– স্যরি।

– এই এক দোষ তোমাদের। একটা ভুল করে বলো স্যরি। একটা অন্যায় করে বলো স্যরি। এমনকি খুন করেও বলো স্যরি। স্যরি বললেই কি সব ভুল শুধরে যায় ? সব অন্যায় ন্যায় হয়ে যায়। সব জীবন ফিরে পায় ?

হিসহিস করে ওঠে জোনাক রাজ্যের রাজকুমারী। তাই তো। প্রতিদিন জেনে, না জেনে, স্বেচ্ছায়, অনিচ্ছায়, কত ভুল আমরা করি, কত অন্যায় করি। আমাদের সে ভুলে, আমাদের সে অন্যায় কাজে কত মানুষের কত ক্ষতি হয়, আমরা শুধু স্যরি বলে পার পেয়ে যাই। আবারও সে ভুল করি, আবারও সে অন্যায় করি। আমরা মানুষেরা আসলে কখনওই শুধরাই না। ঝোপের কাছেই একটা বাঁশের বেঞ্চি। হয়ত ঘেরে কাজ করতে আসা কামলাদের বসার জন্য। আমি অবনত মস্তকে সে বেঞ্চিতে বসে পড়ি। মুখে কোনো কথা সরে না। আমার অনুতাপ দেখে বুঝি মায়া হয় কাজল রাণীর। মোলায়েম কণ্ঠে বলে,

– থাক। অত লজ্জা পেতে হবে না। এর চাইতেও খারাপ কাজ কত মানুষ করে। মনিষীদের কথা তারা শোনে না। আইনের শাসন তারা মানে না। আমার মতো পোকামাকড়ের কথায় কী আসে যায়?

– তাহলে আমাকে বললে কেন?

– তোমাকে দেখে আমার একজন ভালো মানুষ মনে হয়েছে। তাই বললাম। এ পথে তেমন কেউ আসে না। গত এক সপ্তাহ ধরে দেখছি, তুমি এই পথ ধরে, রোজ সকালে আনমনে হেঁটে যাও। নিজের সাথেই নিজে কী সব গুনগুন করে কথা কও। গাছের পাতাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে আদর কর। তোমাকে দেখে আমার অন্যরকম মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, মানুষের মাঝে এখনও কেউ কেউ আছে, যারা আজও প্রকৃতিকে ভালোবাসে। তোমাকে আমার খুব ভালো লেগে গেল। সেই তুমি যখন ফুলগুলো ছিঁড়লে, তখন বড় কষ্ট লাগল আমার। তুমি না ডাক্তার? প্রাণ বাঁচানোই তো তোমার কাজ। প্রাণ নেয়া তো নয়। হোক সে মানুষের, ফুল, পাতা কিংবা পোকামাকড়ের।

– আমাকে আর লজ্জা দিও না কাজল রাণী। আমার সত্যি বড় ভুল হয়ে গেছে। আসলে আমার মনটা ভালো নেই।

– কেন ? তোমার মনের আবার কী হল ? তোমাকে দেখে তো একজন সুখী, সফল মানুষ বলেই মনে হয়। তোমার তো কোনো কষ্ট থাকার কথা নয় ?

এবার আমি হেসে ফেলি। তবে সে হাসিতে খুশির চেয়ে কান্না ঝরে বেশি। ম্লান কণ্ঠে বলি,

– তোমাদের আর আমাদের মধ্যে পার্থক্য কি জানো? আমারা মানুষেরা খুব বর্ণচোরা প্রাণী। আমাদের মনটাকে আমরা বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখি। আর মুখে একটা মুখোশ পরে থাকি। আমাদের মুখ দেখে মন বোঝা যায় না।

– সে আর আমাদের চেয়ে ভালো কে জানে? তোমরা ঘুমিয়ে গেলে, রাতের আঁধারে আলো জ্বেলে আমরা দেখতে পাই তোমাদের আসল রূপ। আচ্ছা, বাদ দাও। তার চেয়ে বলো কেন তোমার মন খারাপ?

– কেন, শোনোনি ? করোনা পৃথিবী আক্রমণ করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। মরছে মানুষ হাজারে হাজার।

– বলো কী ? ওরা কি ভিন গ্রহ থেকে এসেছে ? ঐ যে তোমদের বৈজ্ঞানিকরা এলিয়েন না ফেলিয়েন কী বলে।

– না না, ভিন গ্রহ থেকে নয়। ওরা এই গ্রহেরই।

– তাহলে কি ওরা ডাইনোসর জাতীয় কেউ? শুনেছি, ওরা নাকি মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

– আরে নানা, ডাইনোসর নয়। ওরা তোমার চেয়েও কয়েক হাজার গুন ছোট।

এবার খিলখিল করে হেসে ওঠে জোনাক রাজ্যের রাজকুমারী। সে হাসি যেন থামতেই চায় না। যেন দুপাশে বেণী দুলিয়ে হাসছে এক বালিকা সার্কাসের কোনো ক্লাউনের কথা শুনে। হাসতে হাসতেই বলল,

– হাসালে ডাক্তার। প্রকৃতি তোমাদের সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে তৈরি করেছেন। দিয়েছেন অনেক শক্তি। তোমাদের শক্তি আর বুদ্ধির কাছে হেরে গেছে তোমাদের চেয়েও কয়েকশো গুন বড় ও শক্তিশালী ডাইনোসরেরা। হারিয়ে গেছে কত হিংস্র প্রাণী। তোমাদের শক্তি এখন এতটাই প্রবল, এমন মারণাস্ত্র তোমরা তৈরি করে রেখেছ, যেই পৃথিবীতে তোমার বাস করো, সেই পৃথিবীকেই কয়েকবার ধ্বংস করে দিতে পারো। সেই তোমরা এখন ধূলিকণার চেয়েও ছোট এক দল পোকার ভয়ে ঘরের কোনে মুখ লুকিয়েছ?

– মুশকিল তো সেখানেই কাজল রাণী। ওদের দেখা যায় না বলেই তো ওদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারছি না। ওরা মিশে থাকে মানুষের নিশ্বাসে। কার নিশ্বাস থেকে বেরিয়ে কাকে আক্রমণ করবে কেউ জানে না। সামাজিক জীব হিসেবে গর্ব করা এই মানব জাতি আজ অসামাজিক হয়ে গেছে। কেউ কারও কাছে আসে না। কেউ কারও বাড়িতে যায় না। মিল কারখানা বন্ধ, দোকান-পাট বন্ধ। মানুষ নিজের ঘরেই নিজে বন্দি হয়ে আছে।
– এর জন্যও কিন্তু তোমরাই দায়ী। প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সন্তান তোমরা। অথচ তোমরা ভুলে গেছ, তোমরাই প্রকৃতির একমাত্র সন্তান নও। এই পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ প্রজাতির সন্তান আছে প্রকৃতির। হতে পারে তারা তোমাদের চেয়ে শক্তিতে দুর্বল, বুদ্ধিতে কম। আর সেই সুযোগে তোমরা দখল করে নিচ্ছ তাদের আবাসস্থল, উজাড় করে দিচ্ছ অভয়ারণ্য, কেটে সমান করছ পাহাড়, সে পাহাড়ের মাটি, পাথর দিয়ে ভরাট করে দিচ্ছ নদী, নালা, খাল, বিল। সেখানে উঠছে তোমাদের আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা। গড়ে উঠছে কল কারখানা। তার বিষাক্ত নিশ্বাসে দূষিত হয়ে উঠছে পৃথিবীর বাতাস। তার বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। তোমাদের জন্যই ভারসাম্য হারাচ্ছে প্রকৃতি। তোমাদের হাতেই বিপন্ন আজ পৃথিবী। সেই জন্যই হয়ত প্রকৃতির রোষে তৈরি হয়েছে করোনা।

– এত কিছু তুমি জানো কেমন করে ?

– জানতে হয় ডাক্তার। আমাদেরও যে তোমাদের বিরুদ্ধে অস্তিত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকতে হয়। তবে চিন্তা করো না। বরাবরের মতো এই যুদ্ধেও যে কোনো মূল্যে তোমরাই জয়ী হবে। অন্তত ইতিহাস তাই বলে। হয়ত সময় লাগবে। এখন ঘরে ফিরে যাও ডাক্তার। অনেক বেলা হল। মানুষ বাইরে বের হচ্ছে। সেই সাথে অদৃশ্য করোনা। তোমার ঘরের মানুষেরা চিন্তা করবে।

একটা সামান্য জোনাক পোকার জীবনবোধ দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। কাজল রাণীর কথা আমার চিন্তা চেতনার ভিত ধরে নাড়িয়ে দেয়। আমি অবাক হয়ে ভাবি, তাই তো, শক্তিতে, বুদ্ধিতে বড় বলে আমাদের হাতে প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে কত অযুত কোটি প্রাণী। অথচ সব প্রাণীরই তো এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সমান অধিকার আছে। আমরা শুধু আমাদের স্বার্থের কথাটাই ভাবি। অন্যদের কথা ভাবি না। একটা জোনাক পোকা আমার মনে এক অপার্থিব নীলাভ আলো জ্বালিয়ে দেয়। সে আলোয় নিজেকে একটা পোকার চেয়েও নিকৃষ্ট মনে হয়। এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা ভর করে মনের ভেতর। জীবনটাকে কেমন অর্থহীন মনে হয়। আমার যেন কোথাও আর যাবার নেই। ঘরে ফেরার কোনো তাড়া নেই। সেই তো স্বার্থের টানাপোড়ন। সেই তো মুখ ঢাকা মুখোশের দুনিয়া। সেই তো ভালো থাকার, ভালোমানুষীর অভিনয়। জীবনের প্রতি কেমন এক বৈরাগ্যের ভাব চলে আসে।

– কী ভাবছ এত ? যাও, ঘরে ফিরে যাও। তোমার মহারানী তোমার পথ চেয়ে বসে আছে।

জোনাকির কথায় ধ্যান ভাঙ্গে আমার। খুব ইচ্ছে করে বলি, এই পৃথিবীতে কেউ কারও জন্য বসে থাকে না। সবাই যে যার প্রয়োজনে বসে থাকে। মানুষগুলো আকাশের তারার মতই। দূর থেকে দেখে কাছাকাছি মনে হলেও আসলে যোজন যোজন দূরে। যে যার মতো একান্তই একা। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। কী লাভ এ সব বলে? আমার কেন জানি মনে হয়, পোকারাও জানে, কত স্বার্থপর এই মানব জাতি। কতটা নিঃসঙ্গ! প্রকৃতির হাতে কতটা অসহায়! তবে আমার খুব ভালো লেগে যায় জোনাক রাজ্যের এই অদেখা রাজকুমারীকে। বললাম,

– আর একটু বসি? খুব ভালো লাগছে তোমার সাথে কথা বলতে। খুব ভালো লাগছে, তোমার আলোয় নিজেকে আবার নতুন করে চিনতে।

– এই কথাটা খুব ভালো বলেছ ডাক্তার। আসলে আমরা, জোনাকিরা, এক অন্যকে আলো দিয়েই চিনি। সে আলোয় কোনো ভণিতা থাকে না। এখন আমাদের স্বয়ম্বরা চলছে। জোনাকের আলো দেখে জোনাকিদের পতি পছন্দ করতে হয়। এখন আমার দিবা নিদ্রার সময়। তুমি তোমার প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাও ডাক্তার।

আহা, কত সুন্দর, আলোকিত জোনাকিদের জীবন। অথচ এমন কোনো আলো নেই পৃথিবীতে, যা দিয়ে মানুষের মন দেখতে পারা যায়। প্রিয়জন চিনতে পারা যায়। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আমার খুব ইচ্ছে করে বলি, আমি যদি আজ রাতে জোনাক পোকা হয়ে আসি, তুমি কি আমায় পতি হিসেবে নির্বাচিত করবে রাজকুমারী ? ভাবতেই আনমনে হেসে উঠি। একজন মানুষ হয়ে একটা পোকাকে এ সব কথা বলা যায় না। হাসতে হাসতে জীবনের প্রতি উদাসীন আমি বাড়ির পথ ধরি।

দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড. কে. নিপা

,

Post navigation

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *