জোনাকির আলো (শেষ পর্ব)

আফতাব হোসেন
লন্ডন, ইংল্যান্ড।

গল্পঃ জোনাকির আলো
(শেষ পর্ব)

সে রাতে আমার ঘুম আসছিল না কিছুতেই। রাত্রি গভীর থেকে গভীর হয় আরও। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সম্ভবত কৃষ্ণপক্ষ চলছে। চাঁদ নেই আকাশে। শুধু দূর আকাশে এখানে সেখানে, দুএকটা তারা মিটিমিটি জ্বলে। তার আলো আসে না পৃথিবীতে। রাস্তার নিয়ন বাতিগুলো রাত দশটার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বাড়ি ঘরের বাইরের বাতি জ্বালানো। দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে দেশের অর্থনীতির চাকা। বন্ধ হয়ে আছে প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার রেমিট্যান্স। ক্রমেই নেমে আসছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। শুধু করোনা আতংকে নয়, অর্থ কষ্টেও ধুঁকছে গরীব এই দেশ। তাই এই কৃচ্ছতা সাধন।

রাজকুমারী কাজল রানীকে মাথা থেকে তাড়াতে পারছিলাম না কিছুতেই। জোনাকি পোকাটা যেন আমার মগজের মধ্যে ঢুকে গেছে। আসলেই কি জোনাক রাজ্য বলে কিছু আছে? আছে কি সে দেশে কোনো রাজকুমারী, যে কিনা মানুষের মতো কথা কয়? নাকি পুরাটাই আমার মতিভ্রম? মেডিকেলের ভাষায় একে অডিটরি হালুসিনেশন বলে। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? করোনা কোনো এক ফাঁকে নিঃশব্দে ঢুকে পড়েনি তো আমার শরীরে? করোনা সংক্রামণের যে কয়টি লক্ষণ আমি জানি, তার মধ্যে এমন কোনো পাগলামির লক্ষণ তো নেই! আমার নিজেকেও পাগল মনে হচ্ছে না কিছুতেই। চিন্তা, চেতনা, যুক্তি, ভাবনা, সব পরিষ্কার। যেন জোনাকির আলোয় আলোকিত হয়ে আছে আমার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষ। সেই সকাল থেকেই মনে হচ্ছে, এ আমাদেরই কর্মফল। এ যেন প্রকৃতির পক্ষ থেকে আমাদের অহংকার, আমাদের ঔদ্ধত্যের প্রতিদান।

এদিকে প্রতিদিন আরও হিংস্র, আরও নৃশংস হয়ে উঠছে করোনা। পুনঃপৌনিক হারে বাড়ছে এদের সংখ্যা, বাড়ছে এদের শক্তি। কোনো এক দুর্ভেদ্য কারণে এবার চেঙ্গিস খানের দল চায়না জয় করার পর, এশিয়ার গরীব দেশগুলোকে উপেক্ষা করে, প্রথমেই আক্রমণ করে বসেছিল উন্নত বিশ্ব বলে খ্যাত বিশাল শক্তিধর ইউরোপ ও আমেরিকাকে। শ্বৈর্যে, বীর্যে, শক্তিতে, সম্পদে, শিক্ষায়, দীক্ষায়, চিকিৎসা ব্যবস্থায় সর্বশ্রেষ্ঠ দুটি দাম্ভিক মহাদেশ অসহায় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল মানবতার পরাজয়। বড় বড় রাঘব বোয়ালদের শায়েস্তা করার পর এবার করোনার নজর পড়েছে চুনোপুঁটিদের উপর। প্রবল পরাক্রমশালী দেশগুলিই যেখানে নাস্তানাবুদ হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ তো করোনার তাণ্ডবে এক ফুৎকারেই উড়ে যাবে। ভাবতেই একটা অনুভূতি ঠাণ্ডা সাপের মতো আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নীচে নেমে যায়।

সে রাতে ছিল চৈত্রের গুমোট গরম। এক ফোটা বাতাস নেই কোথাও। স্থির হয়ে আছে গাছের পাতা। থমকে দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকার সময়। চারিদিকে কবরের নিস্তব্ধতা। আমি দুচোখ বন্ধ করি। যেন দূরে লাশ বাহি ট্রেনের হুইসল শুনতে পাই। বিড়বিড় করে বলি,
রাতের নিস্তব্ধতায় আমি কান পেতে রই,
মৃত্যুর পদধ্বনি বুঝি শোনা যায় ওই।
চাই না বাঁচতে এমন বন্দি মানব জীবন,
কখন আসে হাতে অকাল মৃত্যুর সমন!

পরদিন সকালে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। আমার কপালে, চোখে, ঠোঁটে, এক উষ্ণ নরম আলতো ছোঁয়া অনুভব করি। যেন প্রেয়সীর পরম মমতার চুম্বন, ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার সমস্ত মুখমণ্ডল। শেষ কবে এমন আদরে সিক্ত হয়েছি, মনে পড়ে না। আমি কি স্বপ্ন দেখছি? ভয়ে আমি চোখ খুলি না। পাছে স্বপ্নটা ভেঙ্গে যায়। এমন সময় ফিসফিস করে কানের কাছে কেউ বলে ওঠে,
– ডাক্তার, ও ডাক্তার। ওঠো, আর কত ঘুমাবে?

কাজল রাণীর কণ্ঠ? এমন আদর করে আমাকে ডাক্তার বলে যে একমাত্র জোনাক রাজ্যের রাজকুমারী, কাজল রাণীই ডেকেছিল! আমি ঝট করে চোখ খুলি। বিছানায় আমি একা। কেউ নেই। গিন্নী হয়ত উঠে গেছেন অনেক আগেই। ততোক্ষণে সূর্যদেব আমার জানালায় উঁকি দিয়েছেন। তারই কৃষ্ণচূড়া রোদের উষ্ণতা আমার চোখে, মুখে, কপালে। এত বেলা করে ঘুমিয়েছি ? আজ মুয়াজ্জিনের আযান, পাখিদের কলরব, কোকিলের কুহুতান, কিছুই কানে যায়নি। আমি উঠে বসতে যাই। অনুভব করি সমস্ত শরীরে ব্যথা, অবসাদ। ভারি হয়ে আছে মুখ, চোখ, নাক। আমি আবার শুয়ে পড়ি। এবার মাথার ভেতর কাজল রাণীর কণ্ঠ,
– কী হলো ডাক্তার? আসবে না? আমি যে পথ চেয়ে বসে আছি!
শুনে আমি শিউরে উঠি। ইনফেকশন কিংবা সিজোফ্রেনিয়ার একটা লক্ষণ। আমার হাতের পিঠ দিয়ে কপাল স্পর্শ করি। না জ্বর নেই। তবে কি সিজোফ্রেনিয়া ? মস্তিষ্ক বিকৃতি ? আমি ঘরের চারিদিকে চোখ বুলাই। না, অস্বাভাবিক কিছু দেখছি না। মানে ভিজুয়াল হালুসিনেশন বা দৃষ্টি বিভ্রম নেই।
– কই, ওঠো, তৈরি হয়ে নাও আমার ডাক্তার।
আবার মাথার ভেতর থেকে অহ্লাদী গলায় বলে কাজল রাণী। সব কেমন এলোমেলো লাগে। শুধু মনে হয়, ডাকছে আমাকে জোনাক রাজ্যের রাজকুমারী। আমাকে যেতে হবে। আমি শরীরটাকে বিছানা হতে টেনে তুলি। ওয়াশ রুমে যেয়ে ফ্রেস হই। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কাপড় বদলাই। সবাই ব্যস্ত কিচেনে নাস্তা বানাতে। আমি কাউকে না বলে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ি।

আমি এলোমেলো পায়ে চেনা পথে অচেনা মানুষের মতো হেঁটে চলি। বুকের ভেতর জোনাকির আলোর উষ্ণতা। কানের ভেতর জোনাকি পোকার গুনগুন পাখার শব্দ। আর কোনো শব্দ আমার কানে যায় না। পাখিদের কোলাহল, রিক্সার টিংটিং, অটো কিংবা মটর সাইকেলের হর্ন, কিছুই আমি শুনতে পাই না। রাস্তার পাশে শুয়ে বসে থাকা কুকুরগুলো নিত্য দিনের চেনা মানুষটার এমন অচেনা আচরণে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। কেউ কেউ দু কদম পাশে পাশে হাঁটে। তার পর ফিরে যায় আপনজনদের কাছে। আমার কেবলই মনে হয়ে, এই পৃথিবীতে সবাই একা। স্বার্থের প্রয়োজনে হয়ত কিছুক্ষণ পথের সাথী হয়। তারপর যে যার পথে চলে যায়। আমি আপন মনে আবৃত্তি করি,
“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে…”
বেশ কড়া রোদ আজ। কুয়াশার আশা আজ দুরাশা। জোনাক রাজ্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমি ঘেমে জবজবে হয়ে যাই। হাঁপিয়ে পড়ি। ক্লান্ত শরীরে বসে পড়ি ঝোপের পাশের বেঞ্চিতে। প্রথমেই চারিদিক ভালো করে দেখে নেই। কেউ নেই কিছু নেই। নাহ, দৃষ্টি বিভ্রম শুরু হয়নি এখনো। মাথা পরিষ্কার। আমি আর একবার এদিক ওদিক দেখে নিয়ে ফিসফিস করে ডাকি,
– কাজল, ও কাজল রাণী, আমি এসেছি।
– “এতদিন পরে এলে? আমি যে হেথায় পথ পানে চেয়ে কেঁদে মরি আঁখি জলে…”।
বাহ! জোনাকিদের স্কুলে জসীম উদ্দিনও পড়ানো হয় নাকি? তবে এবার মাথার মধ্যে থেকে নয়, সামনের জংলী ফুলে ঢাকা ঝোপের মধ্য থেকে বলে ওঠে কাজল রাণী। হেসে বলি,
– এতদিন কোথায়? কালও তো এসেছিলাম!
– চব্বিশ ঘণ্টায় কত মিনিট হয় জানো ডাক্তার ? তোমাদের এক একটা মিনিট আমাদের এক একটা দিনের সমান। তার উপর সে সময়টা যদি হয় প্রতীক্ষার, তাহলে তো আরও দীর্ঘ মনে হয়।
কী শুনছি এ সব? একটা জোনাকি পোকা, হোক সে তার রাজ্যের রাজকন্যা, কেন সে আমার জন্য, একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা করবে ? আমি মাথাটায় একটা ঝাঁকি দিই। তারপর ভালো করে চারিদিকে দেখি। সব ফকফকে, পরিষ্কার। প্রসঙ্গ পাল্টাতে আমি জিজ্ঞেস করি,
– কাল রাতে না তোমার স্বয়ম্বর ছিল? পছন্দ করতে পারলে তোমার পতি ?
– কী করে পারব? তুমি তো কাল এলে না ? আমি সারা রাত তোমার প্রতীক্ষায় থেকেছি।
অভিমানী কণ্ঠ জোনাকির। অবাক কণ্ঠে বলি,
– মানে কী ? তুমি কেন একটা জোনাকি পোকা হয়ে একটা মানুষের জন্য অপেক্ষা করবে ?
– বাহ ! ভুলে গেলে ? কাল তুমি মনে মনে বললে না, যদি রাতে জোনাক পোকা হয়ে আসো, আমি তোমাকে পতি হিসেবে গ্রহণ করব কিনা? আমি যে তোমার কথা বিশ্বাস করেছিলাম ডাক্তার। আমি যে এখনও মানুষের মতো মানুষকে অবিশ্বাস করতে শিখিনি।

কান্না ভেজা কণ্ঠ জোনাকির। আমার বিস্ময় এবার আকাশ ছুঁয়ে যায়। কাজল রাণী আমার মনের কথাও শুনতে পেরেছে ? তাহলে তো তার এটাও জানার কথা, কাল সারা রাত আমি জোনাকির কথাই ভেবেছি। আমার মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। তাড়াতাড়ি একটা সিগারেট ধরাই। লম্বা টান দিতেই পুড়ে ওঠে গলা, খক খক করে কেশে উঠি। বিস্বাদ লাগে সিগারেটের ধোঁয়া। ছ্যাঁত করে ওঠে বুকের ভেতর। আমি চেইন স্মোকার। তার উপর একজন ডাক্তার। আমি জানি এটা কিসের লক্ষণ। ইনফেকশন!
– কী ভাবে বাধালে ডাক্তার ? তুমি না অবসরপ্রাপ্ত, বেকার? রুগী দেখার বালাই নেই। এই বিলে আসা ছাড়া গত এক সপ্তাহ বাইরেও যাও না। তারপরও…
কথা শেষ করতে পারে না কাজল রাণী। গলা ধরে আসে। বুঝলাম, লুকিয়ে লাভ নেই। সব জানে রাজকুমারী। বললাম,
– কী করব বলো ? আমার সব স্বকার প্রফেশনাল বন্ধুরা চেম্বারের ঝাপ বন্ধ করে সেলফ আইসোলেশনে গিয়েছেন। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো রুগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। মানুষ সরকারি হাসপাতালে যেতে ভয় পায়। গেলেও হয়রানির শিকার হতে হয়। আমি ডাক্তারি ছাড়লেও ডাক্তারি যে আমাকে ছেড়ে যায়নি। তাই, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী কেউ আমার দরজায় কড়া নাড়লে আমি কী ভাবে দরজা বন্ধ করে থাকি বলো ?
– এতদিন তো দেখতাম, ডাক্তাররা রাত দুটো পর্যন্ত রুগী দেখে। তাও অনেক ডাক্তারের সিরিয়াল দুই তিন সপ্তাহেও পাওয়া যায় না। আর এখন যখন পুরো মানবতা বিপর্যয়ের মুখে, যখন ডাক্তারদেরই সব চেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন দেখি, তারা ঘরে বসে, তথাকথিত আইসোলেশনে থেকে, পরিবারকে নিয়ে লুডু খেলে, শরীর চর্চা করে। আবার তার ছবি ফেসবুকেও পোস্ট দেয়।
– ওভাবে বলছ কেন? ডাক্তাররাও তো মানুষ। তাঁদেরও তো মৃত্যু ভয় আছে। তাঁদেরও পরিবার পরিজন আছে। আছে তাদেরও সংক্রামিত হবার ভয়। প্রাইভেট প্রাকটিস করবে কিনা, এটা তাদের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ জন্য তাদের দোষ দেয়া যায় না।
– বাহ, দারুণ খোঁড়া যুক্তি দেখালে ডাক্তার। এই যুক্তি কি সৈনিকদের বেলায়ও খাটাবে ? তারাও তো সারা বছর ব্যারাকে শুয়ে বসে থাকে। কিন্তু যুদ্ধ বাধলে কি বলবে, আমাদেরও জীবন আছে, আমাদেরও পরিবার পরিজন আছে? কখন বুলেট আঘাত হানবে, আমরা যুদ্ধে যাব না।
– তুলনাটা কিন্তু এক হল না কাজল রাণী। সৈনিকদের আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র থাকে, সুরক্ষা বর্ম থাকে। তারা জানে, কাদের সাথে যুদ্ধ করছে। কিন্তু করোনা তো অদৃশ্য। লক্ষণ না থাকলেও একজন সংক্রামিত রুগী এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাতে শুধু ডাক্তারই নয়, অন্য রুগীরাও ইনফেকটেড হতে পারে। ডাক্তারদের পর্যাপ্ত পরিমাণে পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট দেয়া হয়নি। তারা কেন প্রাইভেট প্রাকটিস করে নিজেকে, নিজের পরিবার কে, সর্বোপরি অন্যান্য রুগীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে?
– দেখো, আমাকে রাগিও না ডাক্তার। কী ভাবো তোমরা আমাদের? পোকা মাকড় বলে আমরা কোনো খবরই রাখি না ? প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, সরকারি ডাক্তার যারা প্রাইভেট প্রাকটিস করতেন, তারা রুগীর কাছ থেকে এতদিন হাজার হাজার টাকা কামিয়েছেন। এখন সেই টাকা থেকে একটু খরচ করে নিজেদের সুরক্ষা নিজেরা করতে পারেন না? সবই সরকারকে করতে হবে কেন ? তারা এ দেশের নাগরিক নয় ? শুনলাম, ইংল্যান্ডের আড়াই লক্ষ অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মী স্বেচ্ছায় কাজে যোগ দিয়েছে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। তাদের জীবনের মায়া নেই? ইটালিতে তো ৬৬ জন ডাক্তারই করোনায় মারা গিয়েছে। তাই বলে কি ডাক্তাররা কাজ বন্ধ করে দিয়েছে? বিদেশের কথা বাদই দাও, এই দেশেও পুলিশ, আর্মি, শুধু একটা মাস্ক পড়ে মানুষের কাছে যেয়ে যেয়ে সচেতন করছে। তারা যে অচেনা মানুষটির কাছে যেয়ে কথা বলছে, তাদের কাছ থেকে ইনফেকটেড হতে পারে না? তাদের জীবনের মায়া নেই?

বলে গোখরো সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে হাঁপায় জোনাক রাজ্যের রাজকন্যা। তার যুক্তি আমি একেবারে খণ্ডাতে পারি না। আবার মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করাকে সমর্থনও করতে পারি না। মনে পড়ে, সেদিন এক ফেসবুক বোন তার এক বছরের সন্তানকে নিয়ে শ্বাস কষ্টের জন্য ক্লিনিকে ক্লিনিকে ঘুরেছে, কেউ নেয়নি। লক্ষণ শুনে মনে হল ব্রংকিউলাইটিস অথবা নিউমোনিয়া। তাকে অক্সিজেন দেয়া দরকার। অসহায় এই মাকে আমি কোনো অনলাইন চিকিৎসা দিতে পারিনি। আমি চুপ করে থাকি। কাজল রাণী আবার শুরু করে,
– চুপ করে আছ কেন? কেন ভুলে যাচ্ছ, প্রতিদিন করোনায় যত রুগী আক্রান্ত হচ্ছে কিংবা মরছে, তার চেয়ে কয়েকশো গুন বেশি মানুষ অন্য রোগে ভোগে, মারা যায়। তাদের সেই সব রোগের চিকিৎসা পাবার অধিকার নেই? আর সৈনিকদের যুদ্ধে যাবার উপমাই যখন দিলে, তুমি কি ভুলে গিয়েছ, তোমরা এমন এক জাতি, যারা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এক বিশাল সুশৃঙ্খল আর্মির বিরুদ্ধে থ্রিনটথ্রি রাইফেল আর লাঠি সোটা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মাত্র তিন মাসের ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধ করে ঐ বিশাল বাহিনীকে পরাস্ত করে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে এনেছিল। সেই জাতির সন্তান হয়ে তোমরা কী ভাবে এতটা কাপুরুষ হলে?

কাজল রাণীর কথার জবাব না দিতে পেরে আমি জোরে জোরে সিগারেটে টান দেই। অমনি বেদম ভাবে কেশে উঠি। চিরে চিরে ওঠে আমার বুক, গলা। হঠাৎ খুব শীত করে ওঠে। কেঁপে কেঁপে ওঠে শরীর। ঘোলাটে হয়ে আসে দৃষ্টি। হাহাকার করে ওঠে আমার কাজল রাণী,
– ডাক্তার, আমার ডাক্তার, কী হলো তোমার? শীঘ্র বাসায় যাও, ডাক্তার দেখাও।
এত কষ্টের মাঝেও হাসি পায় আমার। হেসে বলি,
– পাগলি ! আমি নিজেই তো ডাক্তার।
– তা জানি। তুমি অনেক বড় ডাক্তার। যাকে বলে একেবারে বিলেত ফেরত। কিন্তু নিজের চিকিৎসা কি নিজে করতে পারবে?
– এ রোগের তেমন চিকিৎসা নেই রে জোনাকি। যে চিকিৎসা হাসপাতালে গেলে পাব, সে চিকিৎসা আমি ঘরে বসে বসেই নিতে পারব। শুধু আমাকে আলাদা থাকতে হবে। আর যদি খুব খারাপ হয়, তাহলে হাসপাতালে যেতে হবে। আইসিইউতে ভেন্টিলেটরের সাপোর্ট নিতে হবে।

বলে আমি চুপ করে থাকি। চুপ করে ভাবি, কাজল রাণী কি জানে আমি শুধু স্মোকই করি না, আমার এজমাও আছে। সাধারণ ভাইরাস আক্রমণ করলেও আমাকে সহজে মুক্তি দেয় না। আর এ তো চেঙ্গিস খানের নাতি। খুব শীত করেছে। আমাকে এখনই ফিরতে হবে। অনেকগুলি জরুরী কাজ করতে হবে। আমার কাছে এখন কেউ নিরাপদ নয়, হয়ত অদেখা এই ছোট্ট পোকাটিও নয়। অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, চুপ করে আছে জোনাকি। অনেকক্ষণ ধরে। আমার ভেতরে বাসায় ফেরার তাড়া। শেষে আমিই নিস্তেজ গলায় বলি,
– কাজল, ও কাজল রাণী। আমি চলে যাচ্ছি। জানিনা, আবার দেখা হবে কিনা। যাবার আগে একবার আমাকে বিদায় দেবে না?
বলতে যেয়ে গলা কেঁপে যায় আমার। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কষ্ট। এক চিনচিনে ব্যথা। যেন খুব প্রিয় কাউকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এমনও কি হয়? একজন প্রায় বৃদ্ধ মানুষ কোনো পোকার প্রেমেও পড়ে? বড় রহস্যময় এই পৃথিবী। যার অনেক কিছুর ব্যাখ্যাই আমাদের কাছে অজানা রয়ে যায়। এখনও কথা বলছে না জোনাকি। বোধহয় দিবা নিদ্রায় চলে গেছে জোনাক রাজ্যের রাজকন্যা। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাড়াই। ক্লান্ত পায়ে বাসার পথ ধরতেই শুনি, পেছন হতে বলছে জোনাকি,
– “মাথার কসম, আবার এসো”।

বলতে যেয়ে একবার কান্নার হেঁচকি তুলল রাজকুমারী। ও কী হেলাল হাফিজ কোট করল? আহা, কতদিন একলা ঘরে এই কবিতা আবৃত্তি করেছি, “ যুগল চোখে জলের ভাষায় আসার সময় কেউ বলেনি, মাথার কসম, আবার এসো”। কতদিন ভেবেছি, এমন কেউ কি আসবে আমার জীবনে, যে এমন করে জলের ভাষায় আমাকে আবার আসার কসম দেবে? শেষ পর্যন্ত কেউ তো এলো এই জীবনে, হোক সে একটা জোনাকি পোকা। বেলা শেষে আমার বুকে নীলাভ আলোর উষ্ণতা দিতে। আমার খুব ইচ্ছে করে, বলি,
“ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়, আমিও ঠিক তেমনই করে, সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই দুঃসময়ে এতোটা পথ একলা এলাম, শুশ্রূষা-হীন। কেউ ডাকেনি, তবুও এলাম, বলতে এলাম, ভালোবাসি”।
বলতে পারি না। কী লাভ মায়া বাড়িয়ে। পোকাদেরও হয়ত মন আছে ! আমি নীরবে বাসার পথ ধরি। পোকাদের চোখ হতে জল ঝরে কিনা আমি জানি না। তবে আমার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নামে। নির্জন বিলের মেঠো পথে কেউ তা দেখতে পায় না।

এর পরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে যায়। আসার সময় ফার্মেসী হতে প্রয়োজনীয় সব ঔষধ-পত্র কিনে নেই। কিনলাম নেই বেশ কিছু মাস্ক, গ্লাভস, ফেসিয়াল টিস্যু, হ্যান্ড সেনিটাইজার, ডিসপোজাবল প্লেট, গ্লাস, বাটি, চামচ, ইত্যাদি। বাসায় এসে জিনিষগুলো আমার স্টাডিতে রেখে দ্রুত শাওয়ার নিতে ঢুকে যাই। প্রতিদিনই যাই। কেউ কোনো ব্যতিক্রম লক্ষ্য করে না। গায়ে জ্বর বুঝতে পারছি, তবুও অনেকক্ষণ ধরে শাওয়ার নিলাম। কে জানে আবার কবে নিতে পারব!
ফ্রেস হয়ে রুমে ঢুকে প্রথমেই মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপ্যালকে ফোন করলাম, আমার ক্লাসমেট। জিজ্ঞেস করি, কী অবস্থা করোনা পরিস্থিতির? ও যা বলল, শুনে আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। করোনা রুগীর স্রোত ঠেকাতে হিমসিম খাচ্ছে। খুলনা বিভাগের দেড় কোটি মানুষের জন্য মাত্র পনেরোটা সরকারী এবং পনেরোটা বেসরকারি ভেন্টিলেটর। সবগুলো অকুপাইড। অথচ সিরিয়াস করোনা রুগীকে একমাত্র ভেন্টিলেটরই বাঁচিয়ে রাখতে পারে। ইউরোপ আমেরিকাই যেখানে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করতে পারেনি। সেখানে আমার দেশের গরীব সরকার এত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ভেন্টিলেটর, আইসিইউ সেটআপ এত অল্প সময়ে ব্যবস্থা করবে কোথা থেকে? ওকে সাবধানে থাকতে বলে ফোন কেটে দিলাম। করোনার কথা ওকে বললাম না। কী লাভ শুধু শুধু লোক জানাজানি করে ?

ফোন রেখে, নতুন মাস্ক পড়ে, আমার স্টাডির দরজায় দাঁড়িয়ে সবাইকে ড্রইং রুমে জড়ো হতে বললাম। সবাই কী হলো, কী হলো বলে তাড়াহুড়া করে ড্রইংরুমে জড়ো হলো। স্টাডির দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকটা বক্তৃতা দেয়ার মতো বললাম,
– শোনো, তোমরা কেউ ভয় পেও না। আমাকে সম্ভবত করোনা আক্রমণ করেছে। আজ থেকে ভালো না হওয়া পর্যন্ত আমি এই রুমেই থাকব। এখানেই খাওয়া দাওয়া, এখানেই গোসল, এখানেই ঘুম। এখন থেকে তোমাদের সাথে কথাবার্তা সব মোবাইলে হবে। আমার প্রয়োজনীয় সব জিনিষপত্র এই রুমের সামনে রেখে আমাকে ফোনে জানিয়ে তোমরা দূরে সরে যাবে। আমি নিয়ে নেব। আমার কাপড় চোপড় আমিই ধোবো। আমার সব খাবার দাবার এখন থেকে ডিসপোজাবল প্লেটে দেবে।

শুনে সবাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কেউ এম্বুলেন্স ডাকতে চাইল। কেউ হাসপাতালে যেতে বলল। গিন্নী আমার সাথে আমার রুমেই থাকতে চাইলেন। আমি ঠাণ্ডা গলায় বললাম,
– এত চিন্তা করো না। হাসপাতালের চেয়ে ঘরেই আমি ভালো থাকব। ডাক্তারদের সাথে আমার যোগাযোগ থাকবে। প্রয়োজন হলে হাসপাতালে যাওয়া যাবে। এখনই লোক জানাজানি করে প্যানিক সৃষ্টি করার দরকার নেই।

বলেই স্টাডির দরজা বন্ধ করে দিলাম। বাইরে তখনও প্রিয়জনদের চিৎকার, কান্না। আমি আর এ সব শুনতে চাই না। আমি আর এই পৃথিবীর কারও সাথে মায়ায় জড়াতে চাই না। এটা এখন আমার একার যুদ্ধ। আমি একাই লড়তে চাই। মৃত্যু যদি আসেই, আমি একাই তার মুখোমুখি হতে চাই।

সেই থেকে এক সপ্তাহ এই আইসোলেসেন সেলে বন্দি আছি। প্রয়োজন ছাড়া কারও সাথে কথা বলি না। শুধু গোপনে স্থানীয় করোনা সেন্টারে ফোন করেছিলাম। ওরা স্যাম্পল পরীক্ষা করে পজিটিভ বলেছে। আমার বাড়ীর সামনে লাল পতাকা টানানো হয়েছে। আমি কাউকে ফোন করি না। কারও ফোন রিসিভ করি না। শুধু পরিবারের লোকজন ফোন করলে বলে দেই ভালো আছি। সুস্থ হবার পর স্যাম্পল করোনা নেগেটিভ হলে বাইরে বেরিয়ে আসব।

বুঝতে পারছি, আমার অবস্থা দিনে দিনে খারাপের দিকে যাচ্ছে। বুকের ভেতর করোনার দল দলে ভারি হচ্ছে। বুঝতে পারছি, আমার হাসপাতালে যাওয়া দরকার। ভেন্টিলেশন লাগতে পারে। চাইলে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে হয়ত একটা আইসিইউ বেড ম্যানেজ করতে পারি। খুব কি জরুরী তা? একা একা এ নিয়ে অনেক ভেবেছি আমি। আমার চাইতে দশ বছর ছোট বয়সে আমার বাবা চলে গিয়েছেন অনেকটা বিনা চিকিৎসায়। কারণ তখনও লিভার সিরোসিসের কোনো চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। আমার বয়স এখন আটান্ন। বাবার রেখে যাওয়া সব দায়িত্ব তার বড় সন্তান হিসাবে আমি পালন করেছি। ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করেছি। স্বামীর দায়িত্ব পালন করেছি। পিতার দায়িত্ব পালন করেছি। আমার আর কোনো দায় দায়িত্ব নেই। এক জীবনে অর্জনের পাল্লাও কম ভারি নয়। একজন সফল কর্মকর্তার চাকরি থেকে অবসর নিলে যেমন সেই অফিসের কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হয় না। একজন সফল মানুষ হিসেবে এখন জীবন থেকে অবসর নিলে এই পৃথিবীর তেমন কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। কাছের ও দূরের প্রিয় মানুষগুলো হয়ত কিছুদিন উহু আহা করবে, কান্নাকাটি করবে, তারপর একদিন সবাই ভুলে যাবে, এই পৃথিবীতে আফতাব হোসেন নামে কেউ ছিল একদিন। পৃথিবী চলবে তার আপন নিয়মে।

অথচ যাদের এখনও অনেক দায়িত্ব পালন করা বাকি, যাদের বেঁচে থাকার উপর নির্ভর করছে অনেকগুলো মানুষের বেঁচে থাকা, সেই সব করোনা আক্রান্ত রুগীদের জন্য আইসিইউ ইউনিটে একটি ভেন্টিলেটর সাপোর্ট আমার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। আমি স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, অবস্থা যত খারাপই হোক, হাসপাতালে যাব না আমি।

কাল রাত থেকে শ্বাস কষ্ট হচ্ছে। চিন্তা চেতনা ভোঁতা হয়ে আসছে। বুঝতে পারছি, শরীরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে। বাড়ছে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ। মৃত্যুর আগে কী মানুষ বুঝতে পারে, সময় আর নেই বাকি? তাহলে আমি কেন বুঝতে পারছি, আজই আমার জীবনের শেষ রাত? হুমায়ুন আহমেদের খুব শখ ছিল, কোনো এক চাঁদনী পসর রাতে, প্রিয় মানুষটির কোলে মাথা রেখে তিনি চলে যাবেন এই প্রিয় পৃথিবী ছেড়ে। অথচ তিনি মারা গিয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে, আমেরিকার এক হাসপাতালের বদ্ধ কুঠুরিতে। আমারও স্বপ্ন ছিল, কোনো এক চাঁদনী রাতে, খোলা আকাশের নীচে, প্রিয় মানুষটির বুকে মাথা রেখে পাড়ি দেব আকাশের পথে। নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, প্রকৃতির প্রেমী এই আমি, কত মানুষের ভালোবাসায় ধন্য এই আমি, ষোলো ফুট বাই বারো ফুট একটা রুমে শুয়ে থেকে, একাকী রাতে, নীরবে, নিভৃতে, চলে যাব দূর অজানায়। মানুষের স্বপ্নগুলো বুঝি এভাবেই অপূর্ণ থেকে যায়!

রাতের খাবারগুলো অভুক্ত পড়ে আছে। খেতে ইচ্ছে করছে না। যাবার আগে পেট ভারি করে কী লাভ? ভীষণ দুর্বল লাগছে। একটা চিঠি লেখা দরকার। বহুদিন হাতে লিখি না। আজ ইচ্ছে করছে। আমার হাতের ছোঁয়া প্রিয় মানুষগুলোর জন্য আমি রেখে যেতে চাই। অনেক কষ্টে একটা প্যাড নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে লিখি,
আমার প্রিয় মানুষেরা,
যদি আমি ফোন না ধরি, যদি দরজা না খুলি, তোমরা ফায়ার সার্ভিস ও করোনা ইউনিটকে ফোন করবে। ওরাই এসে দরজা ভেঙ্গে আমাকে বের করবে। আমার শরীরের সৎকার যেন করোনা প্রোটোকল মেনে করা হয়। আমার শরীরের দুই মিটারের মধ্যে যেন আমার পরিবারের কেউ না আসে। এটাই তোমাদের প্রতি আমার শেষ নির্দেশ।
আমাকে ক্ষমা করে দিও।

আর লিখতে পারি না। শক্তিতে কুলায় না। কাগজটা ভাঁজ করে দরজার নীচ দিয়ে বাইরে ঠেলে দিই। তারপর এলিয়ে পড়ি সাত দিনের পুরনো বিছানায়।

আজান থেমে গেছে অনেক আগেই। পাখিরা এখনো ডেকে চলেছে। ডাকছে এক নিঃসঙ্গ কোকিল। আমার
আমার মুখটা হা হয়ে আছে। গলাটা শুকনা। পিপাসায় শুকিয়ে কাঠ। পানি খেতে ইচ্ছে করছে। বিছানার পাশেই গ্লাসে পানি। আমি হাত বাড়িয়ে নিতে যাই। হাত নাড়াতে পারি না। ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা চুলকাচ্ছে। অথচ আমি পাটাও নাড়াতে পারছি না। যেন পাথর হয়ে গেছে সমস্ত শরীর। আমি কি মারা গেছি? কিন্তু টের পেলাম না কেন? শুনেছি মৃত্যুর সময় অনেক যন্ত্রণা হয়? অথচ চোখ খুলতে পারছি। নাকি আগে থেকেই খোলা ছিল? দেখি ঘরময় নীলাভ আলো। অনেকগুলো জোনাকি পোকা আমার ঘরময় উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের লেজের কাছে জ্বলছে, নীল, হলুদ, সোনালী আলো। হঠাৎ সেই পরিচিত কণ্ঠ,
– ডাক্তার, ও ডাক্তার, আমরা তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।
– কে? কাজল? তুমি এসেছ? কোথায় তুমি?
অবাক কাণ্ড! আমি কথা বলতে পারছি! জোনাকির আলো আমি দেখতে পাচ্ছি!
– এই তো আমি, তোমার চোখের সামনে।
দেখি অপূর্ব সুন্দরী এক যুবতী বসল আমার বিছানায়। কালো মেয়েরাও এত রূপবতী হয়? তার পিঠে গাঁঢ় সবুজ পাখা। পেটের কাছ থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে স্বপ্নিল নীলাভ জোছনা। আমি ফিসফিস করে জানতে চাই,
– কোথায় নিয়ে যাবে আমাকে?
– জোনাক রাজ্যে। যেখানে হিংসা নেই, হানাহানি নেই। ছলনা নেই, অভিনয় নেই। আছে শুধু বিশ্বাসের আলো। সে বিশ্বাসে থাকবে তুমি আমার হয়ে।
– তুমি কি আমাকে পতি হিসেবে গ্রহণ করেছ কাজল রাণী?
– হ্যাঁ। তবে একটা শর্ত আছে?
– কী শর্ত?
– কাজল রাণী নয়, তুমি ডাকবে আমাকে জোনাক বউ বলে।
– আচ্ছা তাই হবে জোনাক বউ।

শুনে জোনাক বউ আমার কপালে তার ওষ্ঠ ছুঁয়ে দেয়। অমনি আমার সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। জোনাক বউ আমাকে দুহাতে তুলে নেয়। আমার শরীরটা যেন পাখির পালকের মতো হালকা মনে হয়। জোনাক বউ আমাকে নিয়ে আকাশের দিকে উড়ে চলে। সাথে তার সখিরা আলো জ্বালিয়ে পথ দেখিয়ে চলে।

সমাপ্ত

বিদ্রঃ এটি একটি গল্প। দয়া করে কেউ সত্যি ভেবে অস্থির হবেন না।

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড কে নিপা

,

Post navigation

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *