কানামাছি মিথ্যে কানামাছি সত্য

সুরভী হাসনীন
ঢাকা।

গল্পঃ কানামাছি মিথ্যা কানামাছি সত্য

এক

আজ তরুকে দেখতে এসে ছেলেপক্ষ অরুকে পছন্দ করে গেছে। সন্ধ্যা থেকে বাড়ির পরিবেশ থমথমে। রাতের ভাত খেতে রাহেলা অনেকবার ডেকে গেছেন অরুকে। রাজিয়া নিজেও অস্বস্তিতে আছেন । জামশেদ সাহেবের বুকের চাপ ব্যাথাটা বাড়ছে। জিভের নিচে স্প্রে দিয়ে শুইয়ে দিয়ে এসছেন । সিংকের ওপর একগাদা এঁটো বাসন জমা। কাজের মেয়েটা আসবে বলেও আসল না। অন্যদিন অরু তরু ধুয়ে ফেলে। হাড়ি ধুতে গিয়ে দুবোন হাসিতে কুটকুটি হয়ে যায়। আর রাজিয়া রাগে গজগজ করেন। একা একা সিংকে জমা বাসন ধুতে গিয়ে চোখের জল মুছে নিলেন আঁচল দিয়ে। তরু কখন এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে দেখতে পাননি।

– মা , সরোতো । আমি ধুচ্ছি । বিশ্রামে যাও ।

ঘাড় ঘুরিয়ে তরুকে দেখে রাগে ফেটে পড়লেন রাজিয়া।
-বেহায়া মেয়ে, একটার পর একটা ছেলের সামনে বসছিস আর উঠছিস। কেউ পছন্দ করে না। ধিঙ্গী মেয়েছেলে হয়ে থাকবি সারা জীবন।

তরু হাসিমুখে সিংক কাচাতে থাকে। অরুটা দরজা বন্ধ করে আছে কখন থেকে। এদিকটা গুছিয়ে পাগলিটাকে দেখতে হবে। আজ খুব আশায় বুক বেঁধেছিল নিজ থেকে। ছেলের সাথে আগে একবার নিজে দেখা করে নিয়েছিল তরু। আগের অভিজ্ঞতাগুলো ওকে এই কাজটা করতে বাধ্য করেছিল। একটানা রিফিউজ হবার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে, আগে দেখা করে জানিয়ে দিয়েছিলো, ছবিতে এক গাদা পাউডারে ফর্সা মেয়েটা আসলে শ্যাম বর্ণের, বাঁ হাতটা ডান হাত থেকে একটু ছোট। বসে থাকলে বোঝার উপায় নেই। এ বিষয়টা আগে দেখতে আসা সব ছেলেকে ও জানিয়েছে একান্ত আলাপের সময়টায়। এবার মা মাথার দিব্যি দিয়েছিল। জাবের, একহারা লম্বা ফর্সা ছেলেটাকে ওর ভালো লেগেছিলো প্রথম দেখায়। সরাসরি নিজের বিষয়টা জানানোর পর জাবেরের আশ্বাসে আজ বাসায় পরিবার নিয়ে বসা। কিন্তু অরু ঢুকতেই জাবেরের মা মত পাল্টে অরুকে পছন্দ করে বসলেন। অরুটা অবশ্য পছন্দ করার মত। মায়ের কাঠালিচাঁপা রঙে, এক মাথা চুল আঁচড়ে উঠলে সাক্ষাত প্রতিমা যেন স্বর্গ থেকে এসে দাঁড়ায়।

হাত মুছে দরজা ধাক্কা দেয় তরু। আলো নিভিয়ে অরু বসে আছে চুপচাপ । অরুর পাশে বসে তরু হেসে ফেলে।

-তুই এত ভাবছিস কেনো। বাবার রিটায়ারমেন্ট এর আগে অন্ত্যতঃ একজন না হয় কমলাম। আমার বদলে তুই ।
-সারাটা জীবন তোর চোখের দিকে তাকাতে কষ্ট হবে আমার আপা।
কথাটা বলতে গিয়ে গলা কেঁপে ওঠে অরুর। খুব সকাল সকাল ছাদে যায় আপা। সূর্যোদয় পছন্দ করে তরু। তরু উঠে দাঁড়ায়।

এ বিয়ে ভেঙে দিতে হবে। যে কোন ভাবে কাজটা করতে হবে তাকে। চোখ মুছে গায়ে কাঁথা টেনে শুয়ে পড়ে অরু। হেমন্ত তার শেষ জানাচ্ছে। হালকা শীতের হিম কি জমাচ্ছে মানুষের নিজকে আজকাল এই ইট কাঠের শহরে?

সূর্যের প্রথম কিরণ যখন তরুর মুখে পড়ে, সমস্ত পৃথিবীর পূণ্য একত্রে স্নান করে দুটো ঠোঁটে। পাশের ছাদ থেকে রিয়াদ মুগ্ধ চোখে দেখে তরুকে প্রতিদিন। এত সহজ স্নিগ্ধতা নারীর মুখে আগে কখনো দেখা হয়নি। কানাডায় ডক্টরেট করতে যাবার আগে উষসী যখন নিশ্চিত ভবিষ্যতের বাহানায় হাত ছেড়ে গিয়েছিলো, তখনও এতটা স্বচ্ছ ছিল না উষসীর চোখ। ঈদের ছুটিতে দেশে এসে খালার বাসায় বেড়াতে আসাটা বৃথা হয়নি রিয়াদের। বুকের মধ্যের শূন্যস্থানটা পূরণ করার মানুষ এই তিন বছরে অনেক খুঁজেছে । সৌন্দর্য ছিলো ঢের, সততা ছিল না। খালার কাছেই নাম জানা তরুর। মেয়েটার একটা খুঁত আছে, খালা জানিয়েছিল। সত্যিই কি এটা খুঁত। রিয়াদ ও তো ভীষণ উত্তেজনায় একটা দুটো শব্দে তোতলায়। কই, তার বায়োতে কোথাও লেখা হয়নি এই খুঁতটা। তরুকে দেখলে রিয়াদের খুব করে গুনের কবিতা মনে পড়ে।

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাত পাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারী মুক্তি দিয়েছে স্বামী সেবার দায় থেকে।
আমি চাই কেউ একজন জিগ্গেস করুক:
আমার জল লাগবে কিনা, নুন লাগবে কিনা।
এটো বাসন, গেন্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি -নির্মলেন্দু গুন

দুই

দরাজ গলায় রিয়াদের আবৃত্তি শুনে তরু রোজ। সূর্যের সাথে মিতালী তার ছোটবেলার থেকে। আজকাল সূর্যের সাথে এক অচেনা কন্ঠস্বর যেন শতবর্ষের অাকর্ষণে টানে। শিহরণ জাগে মনের ভেতর। কোথাও বাঁধা পড়তে ইচ্ছে হয়।

আগুন পোড়ালে তবু কিছু রাখে
কিছু থাকে,
হোক না তা শ্যামল রঙ ছাই,
মানুষে পোড়ালে আর কিছুই রাখে না
কিচ্ছু থাকে না,
খাঁ খাঁ বিরান, আমার কিছু নাই।
-হেলাল হাফিজ

হাফিজের কবিতার মত করে তরু একটানা কথা বলে আজকাল নিজের সাথে। পাশের বাসার ছেলেটার মায়াবী আবৃত্তি ওকে খুব করে টানে। তবুও প্রাণপণ শপথ নেয়া, জড়াবে না কারো সাথে । তিরিশতম বিসিএস প্রিলির রেজাল্টে টিকে গেছে তরু । ভাইভা বাবদ ঘুষ দিতে না হলে সরকারী চাকুরিটা নিশ্চিত ওর। আর এর মধ্যে অরুর বিয়েটা সেরে গেলে বাবা-মা হজ্বে যাবেন। বাসায় তরু একা থাকবে, তাই কাজের খালাকেও ঠিক করে রেখেছেন রাজিয়া। জাবের এর পরিবার এর মাঝে আরো এক দফা দেখে গেছে অরুকে। পান-চিনির তারিখ পরল এ মাসের শেষে । তরু খুব আড়াল করে রেখেছে সে সময়টা নিজেকে। অরুটা কেমন দুর্বোধ্য হচ্ছে দিন কে দিন। জাবের এর সাথেও সহজ হচ্ছে না। ফোনে কথা বলে না। এমনকি জাবের বাসা থেকে বাইরে নিতে চাইলেও অরু সরাসরি জানায় , ও সিক, এখন নয় পরে। বাবা কেমন অপরাধী মুখ করে ঘুরে বেড়ান।

তিন

সকাল থেকে জাবের টেনশনে অস্থির । রাইসার ফোনটা ওকে এলোমেলো করে দিয়েছে। অরু মেয়েটার সব ঠিক। কেবল মিশতে আপত্তি। এজন্যই তরুকে বিয়ে করতে চাওয়া। খুঁত সহ বিয়ে করলে সারা জীবন পায়ের নিচে রাখা যেত। মা যত ঝামেলা বাঁধালো। রাইসা অফিসের পরেও যে সময় দেয় তাতে বউটা সোসাইটি আর মায়ের জন্য দরকার ছিলো। অরু মন্দ না। নতুন কিছুর স্বাদ প্রথম প্রথম ভালো লাগে। রাইসা চৌকস খেলোয়াড়। কিন্তু মেয়েটা আজকাল ডিমান্ড করছে বেশি। একটা মাইকেল কোরস ব্যাগ বা নিউইউর্কের লেটেস্ট লিপস্টিক কালেকশন থেকে নতুন ডিমান্ড নিজেদের ঠিকানা।

গাড়িতে উঠে সামনের মিররে চুল ঠিক করতে গিয়ে অরুকে পেছনে একটা ছেলের সাথে রিক্সা থেকে নামতে দেখে অবাক হয় জাবের। ছেলেটা দারুণ স্মার্ট। শ্যামলা রঙে , কদম ছাঁট চুল সেনাবাহিনীর ইঙ্গিত দিচ্ছে। পেটানো মাসলগুলো টি শার্টের ভাঁজেও প্রকট। দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে কর্মকর্তা বলে দেয়। এই ছেলে কি করছে অরুর সাথে?

-অরু মনি, একটা কাঠগোলাপ কিনে দিলে পড়বে খোঁপায়?

মুহিব এর কথার উত্তরে পেছন ফিরেই অরু দেখে জাবের খুব দ্রুত হেঁটে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে।

চার

পেনশন ফাইলটা হাতে নিয়ে খুব বিশ্রিভাবে দাঁত খুটিয়ে চলেছে মালেক মিয়া। সামনে বসা মানুষটা এই মুহূর্তে অসহায়। বাকি সব ধাপ ঘুষ ছাড়া পার করে দিলেও তার সাইন ছাড়া কাজ শেষ শেষ হবে না, আর পেনশনটাও আটকে যাবে জামশেদ সাহেবের।
-স্যার, চা খান এক্টু। বুলবুলি কি ক্ষতি কইরা দিয়া গেল কনতো। কতগুলা বাঘ মরল। বনের ক্ষতি হইল।

জামশেদ সাহেব মাথা তোলেন। প্রায় আধা ঘন্টা আগে এই চেয়ারে বসেছেন তিনি। মালেক ছেলেটা তার বয়সে ছোট। কিন্তু বেয়াদব, অসম্ভব বেয়াদব। মনে মনে একশটা থাপ্পড় দিয়ে দিয়েছেন ওর আঁচিল ওয়ালা ডান গালটায়। এতক্ষণ পর কথা বলল, তাও ঝড় নিয়ে। গলা স্বাভাবিক করে উত্তর দিলেন -মানুষ ও মারা গেছে মালেক। ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি অনেক।
-হেহে, স্যার, মরছে তো কুত্তা বিলাই। আরো পয়দা হইয়া যাইবো স্যার। বাঘ ভাল্লুক কি আর পয়দা হইব। কন। ওরা তো জাতীয় সম্পদ আছেল , হেহেহে।

পিয়ন চা নিয়ে ঢুকতে ইশারা করে মালেক । মালেকের সামনে চা দিয়ে পিয়ন ছেলেটা চলে যায়। জামশেদ সাহেব প্রচন্ড অপমানিত বোধ করছেন। টাকাটা তার দরকার, জরুরীভাবে দরকার। অরুর বিয়ের তারিখ এগিয়ে দিতে চান বেয়াইন সাহেবা। তার খুব আদরের মেয়ে তরু। যে মেয়েটা কোনদিন কিছু চায়নি। সেই মেয়েটা নাকি বিসিএস প্রিলিতে চান্স পেয়ে বসে আছে। অথচ তিনি বা রাজিয়া কেউ জানেন না। ভাইবা বোর্ডেও উতরে গেছে। বাকিটার জন্য লাখ দুয়েক টাকা লাগবে। সারাজীবন মেয়েটা স্কলারশীপ নিয়ে পড়েছে। কই বাবা হয়ে, মেয়েকে টাকা দেবেন, তা নয়। মেয়েই টাকা দিয়েছে মাস শেষে বাবার হাতে। রাহেলার জন্য একটা জামদানী শাড়ি কিনতে গিয়ে হাত গুটিয়ে ছিলেন। মেয়েটা তিন হাজার টাকা বের করে দিল। অজান্তে আসা চোখের পানি মুছে সামনে তাকালে জামশেদ সাহেব।
-মালেক কত চাও। বলো, টাকাটা আমার এ সপ্তাহের ভেতর দরকার।

সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে মালেক- স্যার আপনের কাছে কমই চাইলাম। দেড় দুই লাখের নীচে করি না। সব কুত্তা বিলাই স্যার বুজলেন। আপনে আশি দেন। বাকি বিশ পাওনের পরে ।

চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়েন জামশেদ সাহেব। এখান থেকে বেরিয়ে তাকে হাঁটতে হবে। তারপর বাস স্ট্যান্ড । রিকশার পথটা হেঁটে যেতে হবে। ছোট ছোট কাজগুলোতে টাকা বাঁচিয়ে চলার অভ্যাসটা করতে হবে আবার। জামশেদ সাহেব এখন বেকার। আচ্ছা , বেকার জীবনের শুরুটা আর শেষে পার্থক্য কি? শুরুতে হতাশার সাথে কোথাও না কোথাও চাকুরি হয়ে যাবার আশা থাকে, প্রিয়ার উত্তপ্ত ঠোঁটের স্বাদ পাওয়া সোনালী বিকেল থাকে, বেঁচে থাকার ইচ্ছে থাকে। পড়ন্ত বেলায় এই বেকারত্বে কি আছে? একগাদা দায়িত্ব শেষের তাড়নায়, ভগ্ন শরীর আর সংসার চাপে, চোখে চশমা চাপানো শুষ্ক ঠোঁটের বউ ছাড়া, যে একটা সময় প্রিয়তমা ছিল।

সৌন্দর্য আমাকে ডেকেছিল
প্রাচুর্য আমাকে ডেকেছিল
আমি যাইনি-
তুমি আমাকে ডাকোনি কখনো
আমি শুধু তোমারই কাছে যাবো।
-রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

বাসের পথে হাঁটতে গিয়ে কটা লাইন মাথায় ঘুরে জামশেদ সাহেবের। একটা সময় তার জীবনেও ছিলো। দুহাজার টাকার মাইনে, রাজিয়ার সুতি শাড়ির সাথে দুটো হাতে মেলানো কাঁচের চুড়ি। বিকেলে একটু দুধ-চা , সাথে বেলা বিস্কুট , পাশের মোড়ায় রাখা রুদ্র-তসলিমার কবিতার বই। তরু কবিতা ভালোবাসে। পুরোন বই গুলো ওড়নার শেষ দিয়ে কি যত্ন করেই না মোছে মেয়েটা ।

পাঁচ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম কিনতে গিয়ে অরুর সাথে পরিচয় মুহিবের । কলা ভবন কোন দিকে জিজ্ঞেস করার জন্য ডাকতেই যেন এক রাজকন্যা ঘুরে তাকিয়েছিল। বি এম এ থেকে ছুটিতে আসা ক্যাপ্টেন মুহিব, সুজুকি জিক্সার থামাতে গিয়ে নিজেই থমকে গিয়েছিল। তারপর সেই ভবনের রাস্তাটা যেন বাকি জীবনের পথ হয়ে উঠল পরের এক ঘন্টা। অভিজাত দর্শনে একটা সামান্য পথ ফুল যার খোঁপায় উঠে নিজেই হয়ে ওঠে পূজোর নৈবদ্য, সেই মেয়েটি কি অবহেলায় ফিরিয়ে দেয় দামী শাড়ি আর হীরের কুঁচির উপহার। তার থেকে এক তোড়া গোলাপ, ঢাকাই তাঁতে ছড়ানো রঙে , কাঁচ চুড়ির মায়া মুহিব জড়িয়েছে গোপনে , গভীরে।

আজ এসেছিল নীলক্ষেতে একটা বইয়ের দোকানে। জন্মদিনের উপহার কি চাই জানতে চাওয়ায় হুমায়ূন সমগ্র উত্তর অরুর। একটানে বাইক নিয়ে পেছনে রাজকন্যা বসিয়ে ছুট । ফুলের দোকানে কাঠগোলাপ দেখে দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় এলো। একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে প্রশ্ন করে ভড়কে দিতে চেয়েছিলো অরুকে। সেখানে ভয়ার্ত অরুর মুখ দেখে পেছন ফিরে তাকাল মুহিব।
-জাবের ভাই! প্লিজেন্ট সারপ্রাইজ, কি খবর বলেন। কত দিন পর দেখা।
-চিনলাম না সরি। শক্ত মুখে জাবের উত্তর দিলো। চোখ এখনো মুহিবের হাতের দিকে, যে হাতটা শক্ত করে অরু ধরেছে জাবের কে দেখেই।

-ক্যাপ্টেন মুহিব, আর্টিলারি। বি এম এ। উদ্ভাস এ আপনি পড়াতেন, বুয়েট 97 ব্যাচ ,ট্রিপলই। রাইট।

-ওহ্, এক্স স্টুডেন্ট ! সো মাই ডিয়ার, তুমি আমার বাগদত্তা হয়ে এখানে, ওর সাথে? নার্ভাসনেস কাটাতে হালকা হাসি ঠোঁটের চারপাশে ঘুরলেও বুকে কাঁপ লাগে ওর মাথা ছাড়ানো, পাঁচ এগারোর উচ্চতায় সটান সিনায় দাঁড়ানো সেনা-কর্মকর্তার পাথর চোখের সম্ভাষনে।

অরু হালকা স্বরে জাবেরকে জিজ্ঞেস করে-আপনারা পরিচিত? ভালোই হলো। ও আমার বয়ফ্রেন্ড। আপনাকে অনেকবার বলতে চেয়েছি। সুযোগ হয়নি। যে ছেলে বড় বোনকে দেখতে এসে ছোট বোনকে পছন্দ করে, তাকে বিয়ে কেন করুণা করাও যায় না। মা বাবার চাপে এই অসম্মানজনক বিয়েতে আমাকে এখনো পর্যন্ত চুপ থাকতে হয়েছে। বাসায় জানিয়ে দেবেন , কণে রাজি নয়। আংটি এখনো পড়াননি। তাই কোনভাবেই আমি আপনার বাগদত্তা নই ।

জাবের তার জীবনে এত বড় ধাক্কা এর আগে কখনো খায়নি। দেখতে সে দারুণ সুপুরুষ। ধারণা ছিলো, যে মেয়ে একবার তাকে দেখবে, তার প্রেম চাইবে বাকি জীবন। সেখানে অরুর মত সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে এভাবে বলল তাকে? জিদ চেপে গেলো জাবেরের। এভাবে অপমান মানে তার নিজের সাথে পরিবারের ও অপমান। বিয়ে এই মেয়েকেই করবে। একটা মাস। তারপর গলা ধাক্কা দিয়ে বের করবে বাড়ি থেকে। পয়সা দিলে রাত পিছু এর থেকে বেশী সরসে জিনিষ মিলবে। মুহিবের চোয়ালের ফুলে ওঠা খেয়াল করে অরু। পাঞ্চ বসাবে কিনা এই ভয়ে আগে মুহিবকে বাইকে উঠতে বলে। হাত চেপে অরুকে যত্ন করে বসায় মুহিব। তারপর জাবের এর দিকে হাত বাড়ায় ।

-আপনাকে এভাবে দেখব ভাবিনি। অরুর ইচ্ছে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন আশা করি। অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও হাত ঝাকিয়ে জাবের স্থানুর মত তাকিয়ে থাকে ঝড় তুলে যাওয়া ইয়ামাহা 15 ভার্সন -3 এর দিকে।

ইচ্ছে করেই আজ মুহিবের কোমর জড়িয়ে বসেছে অরু। এতোদিন এই মানুষটাকে নিজের পুরোপুরি ভাবতে চেয়েও বাবা- মা এর কথা ভেবে আড়াল করে রেখেছিলো অনুভূতির পেখমগুলো। আজ ঐ স্টুপিড লোকটা সামনে দাঁড়াতেই মুহিবের হাত ধরে ফেলল ও। আর একরাশ সাহস এসে ভর করল বুকে। হড়হড় করে কথা বলে বুকটা হাল্কা লাগছে অনেক দিন পর। জ্যামে বাইক থামতে একটা আমড়া কিনে মুখে দেয় । ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের বাসে দিকে তাকিয়ে বরফ জমাট হয়ে যায় মেয়েটা ।

বাবা!

ছয়

ভালবাসি বাবা ভালবাসি
তোমাকে বড্ড ভালবাসি,
বহুদূরে থেকেও বাবা
তোমার কাছে আসি।
তোমাকে বাবা
তোমাকেই ভালোবাসি।
-সুরভী

বাসায় ফিরে জামশেদ সাহেব কিছু খাননি। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। রাজিয়া একটা প্লেটে ভাত তরকারি নিয়ে গিয়ে ফিরে এসে অপেক্ষা করছে তরুর জন্য। টিউশন সেরে আসলে হয়ত মেয়েটা খাওয়াতে পারে বাবাকে। বাসার সামনে মটর সাইকেলের আওয়াজে জানালার কাছে উঠে গেলেন রাজিয়া। এ বাসাটা আর একমাস। সরকারী কর্মচারী কোয়াটার থেকে চলে যেতে হবে। মোহাম্মাদপুরের দুই কামরার একটা বাসা ঠিক করে এসেছেন। অরুর বিয়েতে ঘরের ফার্নিচার পলিশ করে আপাতত দিয়ে দেবেন। মাগরিবের আজানে মাথায় কাপড় তুলে বাসায় ফিরে অরু। বাবার রুমে ঢুকে জামশেদ সাহেবের মাথায় হাত রাখে অরু।

-জাবের ফোন করেছিল। কাল ওরা আকদ্ করাতে আসবে।
এক মুহূর্ত থমকে উত্তর দেয় অরু। জীবনে এই প্রথম বাবার মুখে কথা বলে।
-বাবা, এই বিয়ে না হলে কি হবে? আপার চাকরি হয়ে যাবে, আমি টিউশনি করছি। একটা পার্টটাইম চাকরি খুঁজে নেব। যে লোকটা আপাকে দেখে , সবটা জেনে আগালো, বাড়ি এসে তার আমাকে পছন্দ হয়ে গেল। এমন মানুষের সাথে সারাজীবন সংসার করার থেকে বিয়ে না করা ভালো।

থমকে গিয়ে তাকিয়ে থাকেন জামশেদ সাহেব। তার নিজের মনের ভেতর ঘুরতে থাকা কথাগুলো আর তার আত্মজার মুখে। কিন্তু রাজিয়াকে কি করে বোঝাবেন ? সমাজ- সংসার? বাবাকে চুপ করে থাকতে দেখে মুখ খোলে অরু।

-ওর নাম মুহিব। সেনাবাহিনীতে আছে। আমার সাথে চেনাজানা বছর দুয়েক বাবা। যদি বিয়ে করতে হয় , আপার বিয়ের পর করব। আমার মতের সাথে মুহিব সমর্থন দিয়েছে। অপেক্ষা করব আমরা। জাবেরকে তুমি না করে দাও। বিয়ের জন্য সামাজিকতা নয় বাবা, মানুষ দরকার হয়। সারাটা জীবন পাশে থেকে সম্মান- শ্রদ্ধায় একে অপরের হাত ধরে থাকার মানুষ। জাবের এর মধ্যে অন্যকে সম্মান দেবার চাইতে আদায় করে নেবার ইচ্ছেটাই বেশি।

বিছানা থেকে নেমে মাথা তুলে মেয়ের দিকে তাকান জামশেদ সাহেব। মেয়ে নয় সন্তান। তার দুটো যোগ্য সন্তান রয়েছে। আর চিন্তা করবেন না তিনি। বাবা হিসেবে গর্বে সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করেন। কেবল রাজিয়াকে নিয়ে ভয়। মা হয়ে দুটো মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাবার দায় নিতে পারবে তো রাজিয়া।

সাত

বৃষ্টি আসুক, উঠুক তুমুল বাতাস।
তার কথা, তার মুখ ধুয়ে দিয়ে যাক।
বেদনার গাছটির একই ধড়ে দশ মাথা।
মনের ক্ষতে রয়ে যাক গাঁথা।
আগুন পারেনি মেটাতে সে দ্বিধা,
কলঙ্কমোচন বনবাসে বাঁধা।।
-ফুয়াদ স্বনম

সন্ধ্যের মুখে ঝমঝম আকাশ ভাঙা মেঘ তুফান। দৌড়ে রিকশা ধরতে গিয়ে রিয়াদ খেয়াল করে রিকশায় উঠে বসেছে তরু। পাশে ফিরতেই দেখে সেই ছেলেটা হতবাক মুখে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে বোকার মত। ডেকে বসে।

-আসুন, ভীষণ বৃষ্টি। আমি আপনি একদিকেই যাবো। অনেক কষ্টে এই ভাই যেতে রাজি হয়েছেন।

একছুটে রিকশায় বসে হুড তুলে দেয় রিয়াদ । এক আকাশ মেঘে ঢাকা যখন বাকি পৃথিবীর সব, ভেজা তেরপলে দুটো অভিন্ন মানুষের একে অপরের নির্বাক দৃষ্টি সবাক হয়ে ওঠে। ভারী অথচ শান্ত স্বরে রিয়াদ বলে যায়

কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে
হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব–
আঁধারে মিশে গেছে আর সব।
তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার
নামাতে পারি যদি মনোভার।
শ্রাবণবরিষনে একদা গৃহকোণে
দু কথা বলি যদি কাছে তার
তাহাতে আসে যাবে কিবা কার।।
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তরুর সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে। যে মানুষের অপেক্ষায় এতটা বসন্ত একলা কেটে গেছে, তাকে মিলিয়ে দিলেন সৃষ্টিকর্তা , আজ এভাবে! এ মানুষ ঠকাতে জানে না। ঠকে যায়, তার মতই। একে নির্ভয়ে মন দেয়া যায়। ঘরে বাঁধা পরতে চায় এ পুরুষ, একে ভালোবাসা যায়। যে পুরুষ একবুক ভালোবাসা নিয়ে বসে আছে কেবল দুটো মসৃণ কোমল হাতের আশায় , তাকে নির্দ্বিধায় বলা যায় – “ভালোবাসি” । রিয়াদের বাড়ানো হাত ধরে তরু হুড খোলে রিকশার। আপন মনে গেয়ে ওঠে

এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।
এমন দিনে মন খোলা যায়–
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরোঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়।।

দুটো মানব -মানবীর জীবনে ফিরে আসা বসন্ত দিনে বৃষ্টি যেন সৃষ্টিকর্তার অবিশ্রান্ত করুণা হয়ে ঝড়তে থাকে। মুহিবের মায়ের ফোনটা রাজিয়ার বুকের পাথর নামিয়ে দেয়। সত্য মেনে সৎ পথে চলা গুটি কয়েক মানুষ আজ অবারিত সুখে ভাসবে। অরুর বুকের ভালোবাসার ঝড়ে ধরাসায়ী মুহিব রওয়ানা দেবে বি এম এর পথে। বুক পকেটে একটা কাঠগোলাপ কারো শরীরের গন্ধে, চুলের মায়ায় ভালোবাসার কথা বলে যায়। আর বৃষ্টি ! সে কবিতা হয়ে, গান হয়ে ঝড়ুক তরুর আকাশে। বহুদিন পর আর অকাল শ্রাবণ শেষে উঠুক না হয় একটা পূর্ণিমা চাঁদ তাদের আকাশ জুড়ে।

সমাপ্ত

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড. কে. নিপা

Post navigation