এ শহর আমার চেনা নাই

ঈদ মোবারক
(ঘরে থাকুন, নিরাপদ থাকুন)

কবিতা: এ শহর আমার চেনা নাই

কবি ও আবৃত্তিকার : মোঃ আরিফুর রহমান

খুলনা।

জীবন, ইদানীং ভাব প্রকাশেই অক্ষম
ঘোলা চোখ, কখনো দেখে আকাশ, কখনো জমিন।
বিকেলের ডুবুডুবু সূর্য-স্নানের আক্ষেপ বুকে চেপে
শত শত প্রহর প্রতীক্ষিত হৃদয়
অনস্তিত্ব ভরা চোখে অপলক দৃষ্টিতে
দু-দন্ড আশান্বিত আলো দেখবে বলে
কবে থেকেই বসে আছে, পথহারা, একেলা।

আজকাল যখন, আবদ্ধ জানালায় বাইরে তাকাই
মনের বাসনাগুলো হুড়মুড়িয়ে
ছুটে বেরিয়ে যায়, অজানায়।
তাতে কি?
তাতে কি আমার গায়ে
বসন্তের মিষ্টিমাখা হাওয়ার ছোঁয়া লাগে? লাগে না।
ঘর ছেড়ে যে আমি আর, মুক্ত হতে পারি না।

গায়ের দামাল ছেলেগুলো
আজ আর দল বেঁধে, বাঁকা নারিকেল গাছে চড়ে
দীঘির জলে ঝাঁপ দেয় না,
বড় রাস্তায়, ইদানীং আর হাট বসে না,
নগরীর ব্যস্ততম পথে, পায়ে পায়ে ধুলো ওড়ে না
আকাশের ঐ বুক চিরে, উড়োজাহাজগুলো আর
দাগ কেটে, মোছা মোছা সাদা পথ, এঁকে যায় না।

কোন এক মমতাময়ী মা –
তার দুধের সনৃতানকে ছুঁয়ে দিতে বাধ্য হয়
কাঁচের দেয়ালের ওপাশ থেকে,
কাঁচের ঘরবন্দি অবুঝ শিশুটি
গলাচেরা চিৎকার দিয়ে, শুধু কাঁদে আর কাঁদে
একসময়, ক্লান্ত ওর দেহ, চিরনিদ্রায় শায়িত হয়,
ওপাশে, মায়ের চোখের জল, বুক ভেসে নদী হয়।

শহরের কুকুরগুলো, ক্ষুধায়, জ্বালায়
দল বেঁধে বিড়ালের বুক চিরে খায়,
ফাঁকা রাস্তায় কাকগুলো কা কা করে
উচ্ছিষ্ট খুঁজে বেড়ায়,
আমাদের অর্জনগুলো, বাঁকা গলির মোড়ে মোড়ে,
হোঁচট খায় নিরাশায়।
এ শহর, আমার চেনা নেই
এ শহরও, আমায় চেনে না।

খবর্দার করোনা, বলছি তোকে
চোখ দিবি না কোন শহরের দিকে
কোন গাঁয়ে, খোলা আকাশে বা মুক্ত এই বাতাসে।
এখানের মানুষগুলো বড্ড অসহায়
খবর্দার বলছি, চোখ তুলে নিবো তোর…
হুহ্, শুধুই বেঁচে গেলি
তোকে দেখতে পাই না বলে।

জানিস করোনা-
ছেলেবেলা খুবই ভুতের ভয় ছিল,
আঁধারে একলা বের হতে, পা কাঁপত
বুক ধড়ফর করত
গলা শুকিয়ে হতো কাঠ
অজানা এক আতংক, খেয়ে নিত গোটা শরীর।

আর আজ!
আকাশে বাতাসে জমিনে শুধু তোরই ভয়
ভয়ে ভয়ে নিজ গৃহে, দিবানিশি থাকি বন্দি
ভয়ে ভয়ে সরে সরে বসি, দূরে
ভয়ে ভয়ে আচমকাই উঠি কেঁপে
ভয় হয়, আমার ভীষণ ভয় হয়
কখন কার গা-ঘেঁষে, তুই এসে
ঘাড় মটকে দিবি শেষে।

কত হাজার, লক্ষ প্রাণ অকালেই গেল ঝরে…
শিশু, কিশোর, যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ
পেল না কেউ রেহাই
মারা পড়ল, তোর অদৃশ্য বিষাক্ত ছোবলে।
বল তো করোনা?
কত লক্ষ হৃদয় চিবিয়ে, তবে-ই তুই থামবি?
মিটবে তোর তৃষিত লালসা …
কি এমন শক্রুতা তোর, এ সভ্যতার মধুচক্রে।

এত হাহাকার দেখেনি আগে, জীবিত কোন মানব
পাল্টে গেল, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্বে গর্বিত, সব ইতিহাস
এক ঝটকায় এ ব্রহ্মান্ড বুঝে গেল,
কিভাবে? কোন আঘাত ছাড়াই
শেষ হয়ে যেতে পারে, সব-ই।

তুই বুঝিয়ে দিলি,
যাকে কেউই চোখে দেখি না,
কতটা বিপজ্জনক, আর ভয়ংকর হতে পারে সে!
তোর আগমনে,
বিশ্বাসীরা বুঝে নিল, সৃষ্টিকর্তার প্রমানিক অস্তিত্ব
অবিশ্বাসীরাও মেনে নিল, শ্রেষ্ঠত্বের অসহায়ত্ব
আর ক্ষমতাশালীরা, ভয়ে কুঁকড়ে গেল একদম।
ওরা তো বরাবরই বেশ ভীতু।

কতশত বোমারু বিমান বানিয়েছে, বিশ্ব শাসনে
কতশত মারণাস্ত্র, কত মিসাইল
আরও কত কি হুমকি আছে, ওদের ডেরায়…
কি হল লাভ তাতে?
কোনো রাডার দিয়েই তো
নিখুঁতচিত্রে মারা গেল না তোকে?
সব শ্রমই হল ওদের, পন্ডশ্রম।

যা করোনা যা, দূর হ! তুই দূর হ!
দূর হ! এ পৃথিবী থেকে।
এ চোখের জল যে শুকিয়ে এলো
বুকে চাঁপা পড়ল কষ্টের কয়লা
বড় কষ্ট রে!
তুই যা, তুই দূর হ! দূর হ!…
জীবিত থাকার এ জগত, এ আকাশ
এ বাতাস, এ প্রহর, এ নিশিরাত
শিশির ভেজা ভোর
আর আমার চেনা নেই।

চির চেনা যে শহরে বেড়ে উঠেছি
দৌড়ে নিয়েছি দীর্ঘশ্বাস, দম বেঁধেছি
সব ধ্যান এক করে ভালবেসেছি,
নিভু নিভু আলোয় প্রেয়সীকে দেখেছি,
ঘর বেঁধেছি
স্নেহ-মমতা দিয়ে প্রজন্ম গড়েছি।

অত্যাচার করেছি
অত্যাচার সয়েছিও অনেক
প্রতিবাদে থেকেছি মুখরিত,
মিছিল-মিটিং, আরও কত কি?
প্রতিদিন সকালে পত্রিকায় খুঁজেছি –
তাজা খবর, চাকুরী, হস্তরেখা বা নতুন কোন আশা।
আর আজ, প্রতিদিনই গুনে চলি – ‘লাশ”
আজকাল আমাদের, লাশ গোনাই যেন কাজ।

তোর অশুভ আগমনে, হঠাৎ-ই
সব হয়ে গেল স্তব্ধ হতভম্বিত, নিথর,
সভ্যতার বুকে চাঁপা পড়ল, এক বিশাল পাথর।
এ পাথর শহর আমার, চেনা নাই
এ পাথর শহরও আমায়, চেনে না।

আবার কবে
পাড়ার চায়ের দোকানে, হাতের তালুতে হাত রেখে
আড্ডায় হারাতে পারব?
আবার কবে
সুস্থ শহরে ফুটপাতে বা পার্কের ঢালাই রাস্তাতে
প্রেয়সীর পাশে, পায়ে পায়ে হাঁটতে পারব?
আবার কবে
প্রতিবাদের মিছিলে মিছিলে নিজেকে চিনতে পারব?
আবার কবে
মুক্ত বাতাস বুকে নিয়ে, গোধুলীর আলো গায়ে মেখে, নিজেকে হারাতে পারব?
আবার কবে
প্রজন্মের কান্ডারীরা, নগ্ন পায়ে
মাঠের ধুলো গায়ে মেখে
ঘরে ফিরতে পারবে?
আবার কবে,
ভয় ভেঙ্গে নির্ভয়ে আমরা বাঁচতে পাবর?
আবার কবে…আবার কবে?

তা আমার জানা নেই,
আমি তা জানি না
আমি কিচ্ছু-ই জানি না
কিচ্ছু-ই জানি না।

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড. কে. নিপা

, ,

Post navigation

Leave a Reply

Your email address will not be published.