একটি স্বপ্নের অকাল মৃত্যু

আফতাব হোসেন
লিভারপুল, ইংল্যান্ড।

গল্প: একটি স্বপ্নের অকাল মৃত্যু

মুখবন্ধ: সত্য ঘটনা অবলম্বনে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা। একটু বড় হলেও ধৈর্য ধরে পড়লে আশা করি নিরাশ হবেন না।

ঢং, ঢং, ঢং, ঢং।
কান খাড়া করে গোনে কবির। এক, দুই, তিন, চার। এখনও এক ঘণ্টা বাকি। পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে কবিরের। সেই কোন সকালে দুটা শুকনা রুটি খেয়ে এসেছে। ঘণ্টা দুই আগেই তা হজম হয়ে গেছে। সেই থেকে পেটের অলিতে গলিতে ছুঁচোদের আনাগোনা, থেকে থেকে মিছিল, শ্লোগান। ভিক্টোরিয়া ইনফ্যান্ট স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র কবির। বছর দশেক বয়স। ছোটখাটো, শুকনা-পটকা শরীর। বয়সের তুলনায় বেশ ছোটোই দেখায়। তবু এত খিধা লাগে ক্যান? ওর মাথায় আসে না। যদিও অনেকে ছোট্ট প্লাস্টিকের বক্সে টিফিন নিয়ে আসে। মা, বাবা, চার ভাইবোন নিয়ে ছয় জনের সংসার। বাবা, মুন্সী আঃ রশিদ, খুলনা সদর হাসপাতালের হেড ক্লার্ক। একজনের কামাইয়ে ছয় জনের তিন বেলা ভাতই জোটে না। তো টিফিন আনবে কোথা থেকে? নিজের পেটে হাত বুলায় কবির। লেগে আছে পিঠের সাথে। এমনই চুপসানো পেট, কংকালসার বুক, লাঠির মতো হাত পা নিয়ে কত মানুষকে শুয়ে বসে থাকতে দেখেছে ও রাস্তায়, ফুটপাতে। স্কুলে যাওয়া আসার পথে। দেখেছে ওদের জ্বলজ্বলে চোখ। সে চোখে কি ওরই মতো ক্ষুধার আগুন জ্বলে? ও বুঝতে পারে না।

শেষ পিরিয়ড সমাজ পাঠ। আজ পড়াচ্ছে ভূগোল। ভূগোলে ওর মাথা বরাবরই গোল। ক্ষুধা পেটে তা আরও তালগোল পাকিয়ে যায়। দেশগুলোর নাম এত বিদঘুটে কেন হয়? কোন দেশের রাজধানী কোথায়, তা জেনে আমার কী লাভ? ভাবে কবির। ক্ষুধা ভুলতে মাথা নিচু করে দু’পা নাচাতে শুরু করে। হঠাৎ কেঊ একজন ওর কান ধরে বেঞ্চ থেকে এক ফুট উঁচুতে উঠিয়ে ফেলে। তাকিয়ে দেখে ফেন্সি স্যার। নাম ফ্রান্সিস চৌধুরী। চক্রাবক্রা কাপড় পরে। হেলে দুলে হাঁটে। মেয়েলি কণ্ঠে কথা বলে। ছেলেমেয়েরা পিছনে তাকে তাই ফেন্সি স্যার বলে ডাকে। ফেন্সি বাবুও এক কাঠি বাড়া। সে কবিরকে সম্রাট হুমাউন বলে। ওর ভালো নাম মুন্সী হুমাউন কবির। স্যার কান ধরে কবিরের শরীরটা খরগোসের বাচ্চার মতো এদিক ওদিক দোলাতে দোলাতে বলেন,
– তা, সম্রাট হুমাউন, কোন দেশ জয়ের খুশিতে পা নাচানো হচ্ছিল?
ক্লাসে হাসির রোল ওঠে। একে তো পেটে খিধা, তার উপর সারা ক্লাসের সামনে এমন অপমান! লজ্জায় ওর চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসে। মুখে কোনো কথা ফোটে না। স্যার কান ছেড়ে দিতেই ধপাস করে বেঞ্চিতে বসে পড়ে। ফেন্সি স্যার জানতে চান,
– পড়া করে এসেছেন জাঁহাপনা?
একান্ত বাধ্যগত ছাত্রের মতো মাথা নাড়ে কবির। স্যার জিজ্ঞেস করেন,
– তা, বলেন দেখি, সব চেয়ে ঠাণ্ডা মহাদেশের নাম কী?
যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। এই একটা মহাদেশের নাম ও ঠিক মতো উচ্চারণ করতে পারে না। কি যেন টিকটিকির মতো নাম। অনেক চেষ্টার পর কোনো মতে বলতে পারে,
– ছার, এন্টিটিকা।
– বাহ, কেয়াবাত, মহান সম্রাট একটা মহাদেশের নাম তো বদলাতেই পারেন। বেঞ্চের উপর উঠে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক।
চিকন গলায় হুঙ্কার ছাড়েন ফ্রান্সিস চৌধুরী। ব্যস, এইটুকুই বাকি ছিল, এবার ষোলো কলা পূর্ণ হল। বাকি ক্লাসটা দাঁড়িয়েই কাটাতে হবে। খুব রাগ হয় কবিরের। না হয় একটু ভুল উচ্চারণই করেছে। তাই বলে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে? তবে এক দিক দিয়ে ভালই হল। আজ আর পড়া ধরবে না। হাত উঁচু করে কান ধরে থাকতে থাকতে হাত ব্যথা করে ওর। শেষে নিজের কান ধরে নিজেই ঝুলে থাকে। সাথে ঝুলে থাকে বৈরি সময়।

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ঘুম চলে আসে কবিরের। ঘুম ঘুম চোখে সে দেখে, ফেন্সি স্যার সারা ক্লাসময় হেঁটে হেঁটে পড়াচ্ছেন। কী পড়াচ্ছেন, ঠিকমত কানে যায় না ওর। তবে হঠাৎ একটা নাম শুনে ঘুম ছুটে যায় কবিরের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফেন্সি স্যার বলছেন, “তোমরা শুনে খুশি হবে যে আজ বিকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সার্কিট হাউজ ময়দানে ভাষণ দেবেন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালির জাতির পিতা, এই প্রবাদ প্রতিম মানুষটিকে দেখতে চাইলে তোমরা বিকালে সার্কিট হাউজ মাঠে আসতে পারো।”

এই নামটা বহুবার শুনেছে কবির। প্রথম শোনে প্রায় তিন বছর আগে। তখন দেশে যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের সময় ওরা হাসপাতাল কোয়ার্টারেই ছিল। যুদ্ধ কী জিনিষ জানে না কবির। দেখেওনি কোনদিন। কারণ, দিনে কিংবা রাতে, ওর বাইরে যাওয়া বারণ ছিল। মাঝে মাঝে যখন সাইরেন বেজে উঠত। মা তখন কানে তুলা দিয়ে খাটের নীচে শুয়ে থাকতে বলত। কিন্তু শুনত না কবির। জানালার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে চেয়ে থাকত আকাশের দিকে। কখনও কখনও সেই আকাশে এক সাথে চারটা প্লেন উড়ে যেত। দূর থেকে দেখতে পাখির মতো। যুদ্ধ বলতে ওর কাছে ওই চারটে পাখির উড়ে যাওয়া।
রাত্রি নামার আগেই ঘরে ফিরত সবাই। রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ত। প্রয়োজন ছাড়া বাতি জ্বালাত না কেউ। বড় ভাই মুন্সী আব্দুল করিম, ওর থেকে তেরো বছরের বড়। যুদ্ধের আগে কলেজে পড়ত। রাত একটু গভীর হলে, বাতি নিভিয়ে দিয়ে, ছোট্ট রেডিওটা কানের কাছে নিয়ে কি সব শুনত। সেই রেডিওতে একটা গান প্রায়ই বাজত। “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি ফুলের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি…”। একদিন কবির জানতে চাইল,
– ভাইজান, একটা ফুলকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করতে হয় ক্যান?
– এ ফুল সে ফুল নয় রে পাগলা। এ ফুলের নাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
– বঙ্গবন্ধু মানে কি?
– বঙ্গবন্ধু মানে বঙ্গের বন্ধু, অর্থাৎ বাংলার বন্ধু।
– সে কি একাই বাংলার বন্ধু?
– না, আরও আছে। যারা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে এই দেশটাকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করছে, জীবন দিচ্ছে, যারা এই দেশটাকে ভালবাসছে, তারা সবাই বাংলার বন্ধু।
– তাইলে আর কারও নাম বঙ্গবন্ধু না ক্যান?
– কারণ, তিনি হলেন বাংলার সব বন্ধুদের নেতা। ভালোবেসে সবাই তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছে।
– বঙ্গবন্ধু এখন কোথায়?
– পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তানিরা তাঁকে জেলে আঁটকে রেখেছে।
– পাকিস্তানিরা কি তারে মেরে ফেলবে?
– জানিনা রে ভাই। সেই জন্যই তো আমরা যুদ্ধ করছি।
– তুমিও কি যুদ্ধ করছ ভাইজান? তুমি তো যুদ্ধে যাও নাই।
– যুদ্ধে না যেয়েও যুদ্ধ করা যায়। তুই বুঝবি না। এখন যা, আমারে খবর শুনতে দে।
শেষের কথাগুলো ফিসফিসিয়ে বলেছিল করিম। শুনে আনমনা হয়ে যেত কবির। মনে মনে ভাবত, সেও তো দেশটাকে ভালোবাসে, তাহলে সেও তো একজন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুকে কোনদিন চোখে দেখেনি কবির। শুধু তাঁর ছবি দেখেছে। আর স্বাধীনতার পর বাবার মুখে তাঁর অনেক গল্প শুনেছে। বাবা নাকি বঙ্গবন্ধুর সাথে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়তেন। গোপালগঞ্জে, খৃষ্টান মিশনারি স্কুলে। ওর অবশ্য বিশ্বাস হতে চাইত না। কোথায় বঙ্গবন্ধু আজ বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী, আর কোথায় বাবা সদর হাসপাতালের কেরানি! তবু বাবার মুখে বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনতে ভালো লাগত ওর। বাবা বলতেন,
– বঙ্গবন্ধু আমাদের চেয়ে বয়সে বড় ছিল, তাই আমরা তাঁকে মুজিব ভাই বলে ডাকতাম।
– বড় ছিল ক্যান? সে কি ছাত্র খারাপ ছিল? পরীক্ষায় ফেল করত?
কবিরের প্রশ্ন শুনে রেগে যেতেন বাবা। বলতেন,
– মোটেই খারাপ ছাত্র ছিলেন না বঙ্গবন্ধু। ছিলেন ভীষণ মেধাবী। তবে বেশী পড়তেন না। অল্পতেই হয়ে যেত। ছিলেন ভীষণ ডানপিটে আর সাহসী। অন্যায় দেখলেই রুখে দাঁড়াতেন। ছিলেন গরীবের বন্ধু। কত গরীব ছাত্রকে তাঁর কাপড় দিয়ে দিতেন। আমরা তো গরীব ছিলাম। সব বই কিনতে পারতাম না। বঙ্গবন্ধু কতদিন নিজে না পড়ে তাঁর বই আমাকে দিয়ে দিতেন।
বলতে বলতে বাবার চোখ ছলছল করে উঠত। তবু কবিরের কৌতুহলী মনের খটকা যেত না। জিজ্ঞেস করত,
– তাইলে কি উনি দেরিতে পরা শুরু করছিলেন?
– না, দেরিতে পড়া শুরু করেন নাই। তয়, চোখের অসুখ হওয়াতে চার বছর পড়তে পারেন নাই। সেই জন্যই ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধু চশমা পড়তেন।

শুনে বুকের ভেতরে কেমন করে উঠত কবিরের। আহা, ঐ চার বছর পড়তে পারলে দেশটা চার বছর আগেই স্বাধীন হয়ে যেত। চার বছর আগেই বঙ্গবন্ধু প্রধান মন্ত্রী হয়ে যেতেন। এইভাবে, ভাইজানের মুখে, বাবার মুখে, গল্প শুনতে শুনতে, বঙ্গবন্ধু কবিরের কাছে এক স্বপ্নের রাজকুমার হয়ে গেলেন।

রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার হলেই কবির কান পেতে শুনত। কি গমগমে গলা। যেন বাঘের গর্জন। শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। খুব শখ কবিরের, বঙ্গবন্ধুকে একবার সামনাসামনি দেখার। বছর দুই আগে এসেছিলেন খুলনায়। সেবার খুলনা শহরে মানুষ ঢল নেমেছিল। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না কোথায়ও। মা কবিরকে ঘরের বাইরে যেতে দিল না কোনোমতেই। মানুষের পায়ের তলে পিষে মারা যাবে এই ভয়ে। এখন তো ও অনেক বড় হয়েছে, একা একাই স্কুলে যেতে পারে। এবার সে কাউকে না বলে, একা একাই বঙ্গবন্ধুকে দেখতে যাবে। ভাবতেই কবিরের শরীরে কেমন এক শিহরণ বয়ে যায়।

হঠাৎ চারিদিকে চেঁচামেচি, চিৎকার। কবিরের ধ্যান ভেঙ্গে যায়। দেখে ছেলেমেয়েরা হুড়মুড় করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কখন ছুটির ঘণ্টা পড়ে গেছে, টের পায়নি। তখনও কবির কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি কান ছেড়ে বই খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বাবা নিশ্চয় খাবার নিয়ে বসে আছেন। হাসপাতালের হেড ক্লার্ক হওয়ার সুবাদে প্রতিদিন হাসপাতালের খাবার পান। টেস্ট করার জন্য। খাবার টেস্ট করতে হয় কেন, কবির তা জানে না। বাবা খাবারগুলো একটু জিভে ছুঁইয়ে রেখে দেন কবিরের জন্য। স্কুল ছুটি হলে, হাসপাতালে যেয়ে আব্বার পাশে বসে সে খাবার খায় কবির। বড় স্বাদ সে খাবারের। খাবারের কথা মনে হতেই পেটের ভেতর ক্ষুধার্ত অজগরটা আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে ওঠে। দ্রুত পা চালায় কবির। সার্কিট হাউজ ময়দানকে বামে রেখে এগিয়ে চলে ও। মাঠে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে। স্টেজ সাজানো হচ্ছে। এই স্টেজে দাঁড়িয়ে আজ ভাষণ দেবেন বঙ্গবন্ধু। দূর থেকে হলেও আজ বঙ্গবন্ধুকে দেখবেই কবির। কোর্টের পাশ দিয়ে ফেরি ঘাটের পথ ধরে। ফেরি ঘাটের পাশেই জেলখানা। একটু এগুলেই সদর হাসপাতাল। দূর থেকেই দেখে, দারুণ সাজে সেজেছে হাসপাতাল। বেলুন, ফেস্টুন, রঙিন কাগজে ছেয়ে আছে সব। যেভাবে সাজে ঈদে, পার্বণে। অথচ আজ তো ঈদ, শবে বরাত, কিছুই না। তবে? কারণ যাই হোক, যেদিন এভাবে সাজে হাসপাতাল, সেদিন রুগীদের ভালো খাবার দেয়া হয়। ভাবতেই মুখে পানি চলে আসে ওর। আরও দ্রুত এগিয়ে চলে। কাছে আসতেই চমকে ওঠে। অনেক পুলিশ চারিদিকে। এত পুলিশ কেন? একটু ভয় পেয়ে যায় কবির। তবে দমবার পাত্র নয় সে। এই হাসপাতাল চত্বরেই বড় হয়েছে। এর নাড়ী নক্ষত্র সব তার নখদর্পণে। সে হাসপাতালের পিছনের গেট দিয়ে ঢুকে পড়ে। বাবার অফিসে যেয়ে দেখে, খাঁখাঁ অফিস, কেউ নেই। শুধু মেথরানী মুনিয়া বারান্দা ঝাঁট দিচ্ছে। সবাই কবিরকে চেনে। ও শুধায়,
– বড় বাবু কোথা মুনিয়া?
– হুই ওথা, নয়া দালানে।
দম বন্ধ করে শুনছিল কবির। অস্ফুটে বলে,
– তারপর।
– দেখা করতে হলে নাম ধাম, পরিচয় লিখতে হয়। সপ্তাহখানেক পর আমার সাসপেনসন লেটার চলে আসলো। সাথে শো কজ। কেন সরকারি কর্মচারী হয়ে একজন রাজনৈতিক নেতার সাথে দেখা করলাম? শেষে, আমি কোনো রাজনীতি করি না এবং করবও না, আর কখনও কোনো রাজনৈতিক লোকের সাথে যোগাযোগ রাখব না, এইসব মুচলেকা দিয়ে তিন সপ্তাহ পর চাকরি ফেরত পাইছিলাম। বাপ, আমরা হইলাম গিয়া ছাপোষা মানুষ। রাজনীতি আমাদের জন্য না। এরপর আর কোনদিন বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করি নাই।

হঠাৎ চুপ করে যান আঃ রশিদ। ঘরের ভেতর পিন পতন নিস্তব্ধতা। বৈদ্যুতিক বাতির হলুদ আলোয় কবির দেখে, বাবার মুখে কষ্ট। সে কি বঙ্গবন্ধুর সাথে আর দেখা না করার জন্য? কবির বুঝতে পারে না। কেউ কোনো কথা বলে না। এক সময় বাবাই নীরবতা ভাঙ্গেন।
– আজ স্বীকার করতে লজ্জা নাই। খুব ভীতু আর স্বার্থপর কিসিমের মানুষ আমি। নিজের চাকরি টিকায়া রাখতে আর কোনদিন বঙ্গবন্ধুর সাথে যোগাযোগ করি নাই। রাজনীতি করি নাই। যুদ্ধে যাই নাই। দেশের জন্য কিছুই করি নাই। অথচ মানুষটা আমারে ঠিক মনে রাখছে। রাষ্ট্র প্রধান হইয়াও আমারে খুঁজে বার করছে। এরেই বুঝি জাতির পিতা বলে। সন্তান যতই অন্যায় করুক, পিতা এক সময় ঠিক ক্ষমা করে দেন।

আবার থেমে যান আঃ রশিদ। কবির দেখে, চিকচিক করছে বাবার চোখের কোন। এবার নিজেকে সামলাতে একটু বেশী সময় নেন। কবিরের খুব ইচ্ছে করে, বাবার চোখের পানি মুছে দেয়। লজ্জায় পারে না। বাবা আবার বলতে শুরু করেন,
– দেখো বাবারা, তোমাদের মুখের দিকে চাইয়া আমি কিছু করতে পারি নাই। বাঙ্গালী হওয়ার দায়টুকুও মিটাইতে পারি নাই। এই দেশটার কাছে, ওই মানুষটার কাছে আমার অনেক ঋণ। যদি পারো, পিতার এই ঋণ তোমরা শোধ কইরো। বড় হইয়া দেশের জন্য কিছু কইরো। যদি মানুষটা আবার কোনদিন আর একটা যুদ্ধের ডাক দেয়, আমার মতো কাপুরুষ হইও না। যুদ্ধে ঝাপাইয়া পইড়ো।

রাতে অনেকক্ষণ ঘুম আসে না কবিরের। ঘুরে ফিরে বাবার কথাগুলো কানে বাজতে থাকে। বাবাকে সে বোকাসোকা মানুষ ভাবত। আজ সে ধারণাটা বদলে গেলো। ওদের স্কুলের হেড মাস্টারের মতো কেমন ভারি ভারি কথা বলছিল। সব কথার অর্থ সে বুঝতেও পারেনি। বাবা আর একটা যুদ্ধের কথা বললেন। কোন সে যুদ্ধ? কবে হবে? ও কি ততদিনে বড় হয়ে যাবে? মা কি ওকে যুদ্ধে যেতে দেবে? মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় কবির। যেদিনই হোক, যদি বঙ্গবন্ধু আর একটা যুদ্ধের ডাক দেন, তবে অবশ্যই সে যুদ্ধে যাবে। পালিয়ে হলেও যাবে। পিতার ঋণ সে অবশ্যই শোধ করবে।

পরদিন কবির অন্য মানুষ হয়ে যায়। ওর ধারণা, এতক্ষণে স্কুলের সবাই কালকের ঘটনা জেনে গেছে। জেনে গেছে, তার মাথায় বঙ্গবন্ধু হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। সে বঙ্গবন্ধুর মতই মাথা উঁচু করে, দৃঢ় পদক্ষেপে, স্কুলে ঢোকে। অথচ কেউ ওকে দেখে কিছু বলে না, কিছু জানতে চায় না। বেশ অবাক হয় কবির। কেউ জিজ্ঞেস না করলে নিজে থেকেই বা বলে কি করে? খুব অহমে লাগে কবিরের। স্থির সিদ্ধান্ত নেয় সে, কথায় নয়, কাজে বঙ্গবন্ধুর মতো হবে। সেও একজন বঙ্গবন্ধু হবে।

সেই থেকে বদলে যায় কবির। মন দিয়ে পড়াশুনা শুরু করে। অবাক হয়ে ছাত্র শিক্ষকরা লক্ষ করে, পড়া না পারার জন্য কখনও কান ধরে বেঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না তার। হাজার ক্ষুধা লাগলেও সে হাসপাতালে রুগীর খাবার খেতে যায় না আর। একদিন বাবা জানতে চায়,
– খাবার খেতে আসিস না কেন বাপ?
– আমার ক্ষিধা লাগে না বাবা।
মিথ্যা বলে কবির। কেমন করে বলবে সে, একজন বঙ্গবন্ধুকে এমন কাজে মানায় না।

এমনি করে বুকের ভেতর বঙ্গবন্ধু হবার স্বপ্নকে লালন করে বেড়ে ওঠে কবির। সপ্তাহ, মাস ঘুরে বছর পেরিয়ে যায়। একজন মেধাবী অথচ সাহসী ছাত্র হিসেবে কবির পরিচিতি পায়। শ্রাবণের শেষ তারিখ। রাতে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে। শ্রাবণ ধারায় প্লাবিত হয় বাংলার খাল, বিল, মাঠ। স্বস্তিতে, নিশ্চিন্তে, ঘুমায় বাঙ্গালি। জানতেও পারে না, সে রাতেই বাংলার এক ঘরে রক্তের প্লাবন বয়ে যায়!

খুব ঘুম কাতুরে কবির। সকালে অনেক কসরত করে মাকে তার ঘুম ভাঙ্গাতে হয়। সে রাতে ঠাণ্ডায় সেও অঘোরে ঘুমায়। যখন ঘুম ভাঙ্গে, দেয়াল ঘড়িতে নয়টা বাজে। আঁতকে ওঠে কবির। আজ স্কুলে যেতে নির্ঘাত দেরি হয়ে যাবে। মা তাকে উঠালো না কেন? বুঝতে পারে না। অথচ ভাইয়া উঠে গেছে। সেও জাগালো না? খুব রাগ হয় কবিরের। স্কুলে দেরি করে যাওয়া একদম পছন্দ না তার। মুখ হাত না ধুয়েই রান্না ঘরের দিকে যায়। যেতে যেতে দেখে বাবা একটা চেয়ারে ঝিম মেরে বসে আছেন। বাবা তো আটটার মধ্যে অফিসে চলে যান। বাবাকে অফিস কামাই করতে দেখেনি কোনদিন। তবে কি তাঁর শরীর খারাপ? রান্না ঘরে যেয়ে দেখে মা গালে হাত দিয়ে বসে আছে। নাস্তা পানি কিছু নেই। ছ্যাঁত করে ওঠে বুকের ভেতর। তবে কি বাবার জটিল কোনো অসুখ? মাকে জিজ্ঞেস করে,
– মা, বাবার কি শরীর খারাপ?
নীরবে মাথা নাড়ে মা। অসহিষ্ণু গলায় কবির বলে ওঠে,
– তাইলে আমারে জাগাও নাই ক্যান? নাস্তা বানাও নাই ক্যান? আমার স্কুলে আজ দেরি হয়ে যাবে।
– আইজ স্কুলে যাওয়া লাগবি না বাপজান।
– ক্যান? স্কুলে যাওয়া লাগবে না ক্যান? বাবাও দেখি অফিসে যান নাই। কী হইছে?
রাগে চিৎকার করে ওঠে কবির। ঠোঁটে আঙ্গুল ঠেকিয়ে মা ফিসফিসিয়ে বলে,
– আস্তে কতা ক। তোর বাপ শুনতি পাবি। কাইল রাইতে আর্মিরা বঙ্গবন্ধুরে মাইরে ফালাইছে।

হতবাক হয়ে যায় কবির। পাকিস্তানিরা তো কত আগে চলে গেছে। তবে কি তারা ফিরে এসেছে? অস্ফুটে জিজ্ঞেস করে,
– পাকিস্তানি আর্মি?
– না, আমাগের আর্মিরা।
আর কিছু কানে যায় না কবিরের। মা আরও কিছু বলছিল। কবির তা কিছুই শুনতে পায় না। কবির বিশ্বাস করতে পারে না, যে মানুষটা এত ভালো, যে মানুষটা তাঁর দেশকে এত ভালোবাসে, এত ভালোবাসে দেশের মানুষকে, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, যে বছরের পর বছর পাকিস্তানিদের জেলে থাকল, যাকে পাকিস্তানিরা মারল না, তাঁকে তাঁর দেশের আর্মিরাই মেরে ফেলল? কবির আর কিছু ভাবতে পারে না। ওর স্বপ্নের দুনিয়াটা ওলটপালট হয়ে যেতে থাকে। ও আস্তে আস্তে বাবার ঘরে যায়। দেখে, তেমনই পাথর হয়ে বসে আছেন বাবা। স্থির, অনড়। শুধু ডান হাতের দুটো আঙ্গুল নড়ছে। একটা একটা তসবির দানা টেনে নিচ্ছেন ধীরে ধীরে। ঠোঁট দুটো চেপে বসা। যেন উদগত কান্নাকে বেঁধে রেখেছেন ঠোঁটের বাঁধনে। বন্ধ দুচোখের পাতা উপচে পড়ছে জলের ধারা। সে জল গাল, দাড়ি বেয়ে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায় কোলের উপর। কবিরের উপস্থিতি টের পান না তিনি। হঠাৎ যেন কবির অনেক বড় হয়ে যায়। ওর খুব ইচ্ছে করে, বাবাকে বুকে টেনে নেয়। কিন্তু কী বলবে সে? বাবার মতো, ভাইয়ের মতো, যে বন্ধু তাঁর মারা গেলো অকালে, তাঁকে কী সান্ত্বনা দেবে সে? কোনো কথা না বলে চুপিচুপি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় কবির।

হাসপাতালের গেটের পাশেই একটা চায়ের দোকান। সেখানে কিছু মানুষ জটলা করছে। তাদের চোখে মুখে কি এক আতঙ্ক। তারা নিচু স্বরে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। কবির ওদের কাছে যেয়ে দাঁড়ায়। ওকে একটা বাচ্চা ছেলে ভেবে তারা তাদের আলোচনা চালিয়ে যায়। কবির শোনে, আর্মিরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই মারেনি, পুরা পরিবারকেই মেরে ফেলেছে। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, ছেলে, ছেলে-বউ, এমন কি দশ বছরের ছেলে রাসেলকেও। ও আর কিছু শুনতে পারে না। ও আর কিছু শুনতেও চায় না। এলোমেলো পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। রাস্তা পার হলেই ভৈরব নদী। একটু দূরেই জেলখানা খেয়াঘাট। খেয়াঘাটের পাশেই একটা বট গাছ। হেলে আছে নদীর উপর। কবির যেয়ে সে গাছের একটা শিকড়ের উপর বসে। কুলুকুলু শব্দে বয়ে চলে ভৈরব। ভৈরবের জল খুব ঘোলা। কিন্তু আজ কবিরের মনে হয়, ভৈরবের পানি খুব লাল। যেন বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পরিবারের রক্তে লাল হয়ে আছে ভৈরবের বুক।

কবিরের ছোট্ট বুকটা তোলপাড় হতে থাকে। ও বুঝতে পারে না, এ কেমন হিংস্রতা? কী এমন অপরাধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু? যার জন্য শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর পুরো পরিবারকে মরে যেতে হল। কী অপরাধ ছিল ছোট্ট রাসেলের? সে তো ওর বয়সীই ছিল। তার বুকেও নিশ্চয় ওর মতো স্বপ্ন ছিল, বড় হয়ে একজন বঙ্গবন্ধু হবার।

কবির মনে মনে বলে, বঙ্গবন্ধু, এ কোন বঙ্গের বন্ধু হয়েছিলে তুমি, যে বঙ্গের মানুষেরা তাদের নেতাকেই মেরে ফেলে? এ কেমন জাতির পিতা হয়েছিলে তুমি, যে জাতির সন্তানেরা তাদের পিতাকেই মেরে ফেলে? আমিও যে স্বপ্ন দেখেছিলাম একজন বঙ্গবন্ধু হবার। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমার ডাকে একবার যুদ্ধে যাবার। আমার যে আর যুদ্ধে যাওয়া হল না!

ডুকরে কেঁদে ওঠে কবির। দুচোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রু ঝরে পড়ে ভৈরবের জলে। সেই সাথে ঝরে পড়ে একটি বালকের একজন বঙ্গবন্ধু হওয়ার স্বপ্ন। সবার অজান্তে ঘটে যায় একটি স্বপ্নের সলীল সমাধি, একটি স্বপ্নের অকাল মৃত্যু।

অচিনপুর ডেস্ক /এসএসববি

,

Post navigation

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *