ইবসেনের নোরাঃ অসাধারণ এক নারী ব্যক্তিত্ব

নিলুফার জাহান
ঢাকা।

বিশ্বসাহিত্যঃ ইবসেনের নোরা : অসাধারণ এক নারী ব্যক্তিত্ব

নরওয়ের বিখ্যাত নাট্যকার Henrick Ibsen তার বিখ্যাত নাটক ‘A Dolls House’ এ এক অনন্য নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন।অসাধারণ এই নারী ব্যক্তিত্ব নোরা বিশ্ববাসীকে নাড়া দিয়েছে কেননা আগে নারীকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ ভাবা হতো না। নিজস্বতাহীন এক পুতুল ভাবা হতো।


নাটকের শুরুতেই আমরা যখন নোরাকে স্বামী হেলমারের সুসজ্জিত ঘরে দেখি, তখন তাকে একজন যথার্থ বুর্জোয়া নারী মনে হয়। একগাদা জিনিসপত্র নিয়ে নোরা বাজার থেকে ফিরছে, গলায় গুন গুন করে গানের সুর, বেয়ারাকে প্রাপ্যের চেয়ে বেশি বকশিশ দিচ্ছে—তার গায়ে শীতের দামি পশমি কাপড়—সব মিলিয়ে নোরা শুরুতেই একজন আদর্শ বুর্জোয়াঁ গৃহিণী। স্বামী তাকে আদর করে ‘কাঠবিড়ালী’ বা ‘ছোট্ট গানের পাখি’ ডাকছে। তার স্বামীর চাকরি শুরু হবে আগামী মাস থেকে, বেতন পেতে এখনো দেরি, তবু সে খরচ শুরু করেছে। স্বামী কম খরচের কথা বললে সে ছেলেমানুষের মতো রাগ করে। স্বামী হেলমার তাকে ক্রিসমাসের জন্য বেশি টাকা দিলে সে খুশি হয়। নোরার শিশুসুলভ আচরণ এবং হেলমারের পিতৃসুলভ আচরণ, বিশেষ করে স্বামী হেলমার যখন নোরার কান ধরে আদর করে তখন, নোরার প্রতি হেলমারের আচরণ অভিভাবকত্বই প্রকাশ করে। ছেলেমেয়ের সাথে লুকোচুরি খেলা, স্বামীকে লুকিয়ে নিষেধ সত্ত্বেও ম্যাকারনি খাওয়া প্রভৃতি আচরণে নোরাকে একজন রয়স্ক শিশু বলে মনে হয়। কিন্তু এই দৃশ্যেই নোরা মিসেস লিন্ডের কাছে বলে যে, তার মনে গর্ব করার মতো বিষয় আছে। কেননা স্বামীর অসুস্থতার সময় সে-ও লুকিয়ে টাকা ধার করেছে; স্বামীর প্রাণ বাঁচানোই তার গর্ব। কিন্তু এই গর্বই তাকে খর্ব করে।

বিয়ের পরপরই ভয়ানকভাবে তার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ে। জীবনাশঙ্কা দেখা দিলে অনন্যোপায় ও বিভ্রান্ত নোরা ক্রগাস্টাসের কাছ থেকে টাকা ধার করেছিল। বিগত আট বছর ধরে সে তা শোধ দিয়ে আসছে। স্বামীকে ভালোবেসেই এই কষ্ট সে স্বীকার করেছে।আপাত চপল, বেহিসাবি নোরার মধ্যে একজন শক্ত ও পরিপক্ক নারী আছে সে ইঙ্গিতও আমরা পেয়ে যাই একেবারে প্রথম দৃশ্যে।

দ্বিতীয়াঙ্কে আমরা নোরাকে আরও পরিণত নারী রূপে চিনি। বিশেষ করে ড. রেঙ্ক ও ক্রগাস্টাসের মুখোমুখি আমরা যে নোরাকে দেখি তা কোনোক্রমেই প্রথম অঙ্কের সেই চপল ‘কাঠবিড়ালী’ বা ছোট্ট গানের পাখি নয়। মৃত্যুপথযাত্রী ড. রেঙ্কের প্রেমাবেদনের জবাবে নোরার সংযত-সহানুভূতিশীল আচরণ এবং ক্রগাস্টাসের হুমকির মুখোমুখি নোরার নির্ভিক আচরণ—এই দুই বৈপরীত্য নোরা চরিত্রকে আরও উজ্জ্বল করে। প্রথমাঙ্কে নোরা গর্ব করেছিল সে স্বামীর জীবন বাঁচিয়েছে। দ্বিতীয় অঙ্কে নোরা লিন্ডাকে জানায় যে, ক্রগাস্টাসের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিল, বর্তমানে ক্রগাস্টাস জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত; একমাত্র নোরার স্বামীই ক্রগাস্টাসকে রক্ষা করতে পারে। ক্রগাস্টাস হুমকি দেয় যে, ঋণপত্রের দলিলে নোরার বাবার স্বাক্ষরের নীচে যে তারিখ আছে তা তার বাবার মৃত্যুর তিন দিন পরের অর স্বাক্ষরটি জাল। কাজেই নোরা যদি ক্রগাস্টাসকে সাহায্য না করে তাহলে তবে সে সব ফাঁস করে দেবে।

স্বামীকে না-জানিয়ে টাকা ধার করা, মৃত পিতার স্বাক্ষর জাল করার পেছনে নোরার ভালোবাসা প্রকাশিত, কিন্তু এতে তার অদূরদর্শিতাও প্রমাণিত। এ ক্ষেত্রে শাশ্বত নারীর আবেগই তার প্রভাবক ছিল।
কিন্তু স্বামী তাকে ভুল বোঝে। খুব খারাপ ব্যবহার করে। গালাগালি করে। ভালোবাসার জন্য সে এতো কষ্ট করেছে সেই তাকে অপরাধী ভাবে।
নোরার চরিত্রকে ব্যক্তি হিসেবে ঝলসে উঠতে দেখা যায় তৃতীয় অঙ্কে অর্থাৎ নাটকের শেষে। ইতিমধ্যে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সবকিছু স্বামীকে খুলে বলবে। কিন্তু স্বামী তাকে শুরুতেই ভুল বোঝে। স্বামীর ভালোবাসায় সে পুনর্বাসিত হলেও ইতিমধ্যে তাদের সম্পর্কের ফাঁক বা ফাটলটি ধরা পড়ে যায়। এই পর্যায়ে নোরার সংলাপেই নারী ব্যক্তিত্বের প্রকাশ দেখা যায়। নোরা বলে, ”বসো, এবার আমারও কিছু বলার আছে। আশ্চর্য হলেও সত্য, আট বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম আমরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনায় বসেছি। আজ পর্যন্ত তুমি আমাকে বুঝতে চাওনি। আমি ছিলাম তোমার সংসারের খেলার পুতুল, যেমন আমি ছিলাম বাবার সংসারের খেলার পুতুল। তুমি আমাকে ব্যক্তি হিসেবে ভালোবাসনি। কেবল ভালোবাসার খেলায় মেতেছ। কিন্তু আমি একজন মানুষ, অন্তত আমি তা-ই হতে চাই।’ সে আরও বলে, ‘তোমার সমস্ত সহৃদয়তার কথা আমার মনে থাকবে হেলমার। কিন্তু এটাও কষ্টের মধ্যে দিয়ে জেনেছি যে, আমাদের মধ্যে ভালোবাসা নেই। তাই, আমি তোমায় ছেড়ে চলে যাচ্ছি টোরভাল্ড।’ —এই কয়েকটি সংলাপ দিয়ে নোরা পূর্ণ নারীতে পরিণত হয়, পূর্ণ মানুষে বিকশিত হয়, স্বতন্ত্র সত্ত্বা খুঁজে পায়। আইন, ধর্ম, নৈতিকথা, প্রথা, সমাজ—সবকিছুর ঊর্ধ্বে ব্যক্তি নোরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে।

নোরা এই পুতুলের সংসারে নানা ভূমিকায় অভিনয় করে গেছে। স্বামী হেলমার টোরভাল্ডের কাছে সে ‘ছোট্ট পাখি’। ছেলেমেয়ের কাছে সে নিজেও শিশু, তাদের খেলার সঙ্গী। ড. রেঙ্কের কাছে সে মোহময়ী, মধুর সঙ্গিনী। মিসেস লেন্ডের সামনে সে দায়িত্ববোধসম্পন্ন গর্বিত স্ত্রী। এইভাবে একই নোরা যেন পুরো নাটকে নানা চরিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছে। কখনো তাকে চপল শিশু মনে হয়, কখনো সুগৃহিণী, কখনো সে কারো কাঙ্ক্ষিতা, প্রেয়সী, কখনো মা। নাটকের অন্যান্য চরিত্রের সাথে মিলিয়ে সেও যেন চরিত্র বারবার বদলে ফেলে। জলের মতোই সে কেবল পাত্র অনুযায়ী বদল হয়। কিন্তু শেষ দৃশ্যে মা নয়, প্রেয়সী নয়, কন্যা নয়—এবার সে নারী, সর্বোপরি মানুষ। মুহূর্তেই সে সব খোলস পাল্টে একক নারীসত্ত্বায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। শেষ দৃশ্যে পোশাক পরিবর্তন করে এসে সে বলে, ‘Yes, Torvald, I’ve changed’ এই পোশাক পরিবর্তন শুধু তার বাহ্যিক আবরণের বদল নয়। পোশাকি পরিবর্তন নয়, সে বদলে ফেলেছে নিজেকেও। এতদিনের পুতুলখেলা ফেলে সে এখন আত্মোপলব্ধিতে সক্ষম। নারী ব্যক্তিত্বের এই উন্মেষ সংসারের সাজানো উপকরণের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ নোরাকে নারীমুক্তির প্রতীক করে তোলে। যে নোরা তার কন্যার জন্য পুতুল কিনে আনে, পুত্রের জন্য তরবারি ও ঘোড়া, সেই নোরাই এবার পুরুষশাসিত সমাজের বিরুদ্ধে পৃথিবীর নাট্য-ইতিহাসে এই প্রথম একজন নারী তার নিজের সাজানো সংসার ছেড়ে প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়ায় স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে। পেছনে তার নিজ হাতে বন্ধ করা নিজের ঘরের দরজা আর সামনে তার অচেনা অবাধ পৃথিবী। তবু তার আত্মোপলব্ধি, নারী ব্যক্তিত্বের উন্মেষ, পুরুষশোষিত সমাজের বিরুদ্ধে তার সংঘর্ষ, তাকে, ‘নোরা’কে আলাদা মানুষ হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত করে।

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড. কে. নিপা

Post navigation