আমার দ্রোহ, আমার প্রেম— কবি শঙ্খ ঘোষ

মেহেদী হাসান তামিম
পুরানা পল্টন, ঢাকা।

বিশ্বসাহিত্যঃ আমার দ্রোহ, আমার প্রেম— কবি শঙ্খ ঘোষ

শুধু এ সময়ের অন্যতম প্রধান ও শীর্ষকবি নয়, রবীন্দ্রোত্তর সৃষ্টিযুগেও যিনি সবচেয়ে উচ্চকবি, তিনি কবি শঙ্খ ঘোষ। কবি হিসেবে কতটুকু পারি, কতটুকু জানি সেটা পুরোপুরি না জানলেও, প্রতীতি আমাকে যতটুকু জানান দেয়, তাতে এতটুকু আমি বুঝতে সক্ষম, তাকে নিয়ে দুকলম লিখবার যোগ্যতা আমার নেই। যোগ্যতা নেই ভেবে চেষ্টাও করব না, তেমন কবিও তো আমি নই। তাকে পাঠকের সাথে আরো একবার, একজন কবিভক্তের চোখে তাকে পরিচয় করিয়ে দেবার তাগিদ থেকে লিখছি।

কেউ কেউ বলেন আধুনিক কবি, কেউ বলেন ছন্দের কবি। আমি তার সাথে আরো বলি মানবতার কবি, বিপন্নতায়, প্রতিকূলতায়, প্রতিঘাতে যার লেখনী বিশ্বস্ত বাহুর মতো ভরসা করে ভর রাখা যায়- তিনি সেই কবি, বাংলা ভাষার কবি, বিশ্বাস ও প্রেমের কবি, রবীন্দ্রোত্তর কবিতা যুগের অন্যতম সেরা কবি, তিনি শঙ্খ ঘোষ।


তাঁর কিছু কবিতার অবিস্মরণীয় অমোঘ পঙক্তিমালা প্রজন্মের কাছে, নতুন কবিত্বের দাবীদারদের কাছে তুলে ধরতে চাই।

কবির প্রথম কবিতাটি নিজ দেশে ছাপার হরফে মুদ্রিত হয়েছিল ১৯৫২ সাল। সেদিনের সেই কবির বয়স ৬৮ পেরিয়েও আজ এক্ষণে দাঁড়িয়ে সেই প্রথম কবিতাটির কথাই সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে। যে কবিতাটি বারবার পড়েও মন বলে উঠবে, আরে এতো আমাদের কথা, আমার চারপাশের নিত্যদিনের গল্প।

কবি তো আসলে তিনিই, চোখ খোলা রেখে দেখবেন যা, তা বন্ধ অবস্থায় দেখবেন তার ঢের গুনে বেশী।

নিজের বর্তমান পরিপার্শ্বিক, আর চোখ বন্ধ করলেই তিনি দেখবেন সুদূর ভবিষ্যতের পটে আঁকা জীবন্তিকা ছবি।

প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোতে কল্পনাপ্রবণ, আবেগপ্রবণ, স্বপ্নপ্রবণ আখ্যায়িত করে কবি-সাহিত্যিক সৃষ্টিশীল মনুষ্যদের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘অযোগ্য’ বলে দাবী করেছিলেন। সরদার ফজলুল করিম স্যারের প্রবন্ধে পড়েছি- যে সমাজে কবিরা, লেখকরা, সৃষ্টিমত্ত মানুষেরা বাস্তবিক সমাজচিত্র, রাষ্ট্রচিত্র, সরকারচিত্র, তথা সত্যচিত্র আঁকতে পারেন না, বরং ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে শুধু তাঁবেদারি তোষামুদে সাহিত্য, পুরস্কার-প্লট-ফ্ল্যাট-মেডেল প্রাপ্তিসাহিত্য, রাষ্ট্রীয় কবির আসনলিপ্সুসাহিত্য রচনা করেন, সে সমাজের ধ্বংস অতি আসন্ন, সে সমাজের ভগ্নস্তুপে পরিণত হবার দিন ছোঁয়াচে কাছের দূরের দিনগুলোতেই।
অপার বিষ্ময়ান্বিত হতে হয়, আমাদের রচনাগুলো যখন সুদীর্ঘ অতীতের কোন কবির কাছে মুখ থুবড়ে পরে, নিমিষে মিলিয়ে যায়। আজ ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের এই নিশুতি রাতিতে আমার লিখার কথা, কিন্তু যখন খুঁজে পাই একি সেই কবিতা বহুযুগ আগে লিখা কোন কবির কলমেই- তখন এটাকে কি নামে ডাকা যায়, দৈবশক্তি না কি জাদু-বাস্তবতা।

কবি শঙ্খ ঘোষ এমনি এক কবি যিনি তাঁর নিজের সময়ে দাঁড়িয়ে সেই সময়ের কথা, সেই সময়ের অনেকানেক পরের কথা- অব্যর্থ দৃঢ়তায়, দ্ব্যর্থহীন দ্যোতনায় কলমের অপার্থিব আঁচড়ে সাদাকালোর সময়ে থেকে এঁকেছেন পুর্ণদৈর্ঘ্য রঙিন ছায়াছবি। ১৯৫২ সালে তাঁর প্রথম ছাপানো কবিতাটি –

“নিভন্ত এই চুল্লিতে মা
একটু আগুন দে,
আরেকটুকাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে!
নোটন নোটন পায়রাগুলি
খাঁচাতে বন্দী-
দুয়েক মুঠো ভাত পেলে তা
ওড়াতে মন দিই!
হায় তোকে ভাত দেবো কী করে যে ভাত দেবো হায়
হায় তোকে ভাত দিই কী দিয়ে যে ভাত দিই হায় “

আবার,
“যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে
যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে
বিষের টোপর নিয়ে!
যমুনাবতী সরস্বতী গেছে এ-পথ দিয়ে
দিয়েছে পথ গিয়ে !
নিভন্ত এই চুল্লিতে বোন আগুন ফলেছে ! “

এক কিশোরীর গল্প সে কবিতা।আমাদের খুব চেনা কোন প্রতিবেশী নারী, যার মৃত্যু রচিত হল পুলিশের গুলিতে ভুখা মিছিলে সমবেত থেকে। গরম নির্জলা ধোঁয়ামেদুর ভাতের সন্ধান তাকে এনে দিল গরম কিছুই, ধোয়া তোলানোই- তবে তা লাল রং বিষনীল করা, খাদ্যনালী ভেদী তাম্রবুলেট । বারুদের কাছে, মৃত্যু এসে সালাম ঠুকে, নুইয়ে দেয় মস্তক। নিভন্ত চুল্লি সেই কিশোরীর দহনে সমাজ হতে আরেক সমাজে নিরবধি বয়ে চলা দাউদাউ আতপ্ত চিতার অগ্নিময়তা, লেলিহান লালস্য শিখা।
শঙ্খ লিখলেন আরো বেশকিছু পরে,
“ভয়াবহ শব্দধূমে ভরে গেছে পৌষের বাতাস
আর সেই অবসরে কোনও কোনও পিশাচ স্বাধীন
রাজপথ থেকে নারী তুলে নিয়ে চলে যায় ট্রাকে ।”

সমাজকে কোমল পেলব মোমমোলায়েম ভাষায় দেখিয়ে দিলেন নারীত্বের অসম্মান ও অবমাননার গীতিকবিতা। এ সময়েও সে যে পূর্ণসমান প্রাসঙ্গিক । নারী আজো ধর্ষিত হয় পাবলিক বাসে, ব্রিজের আড়ালে, প্রকাশ্য রাজপথে, বনানী, ধর্মতলায়।

নিজের কাছে কবিত্ব প্রাত্যাখ্যাত হয়ে বিপন্ন বিষন্ন বোধ উঠে জেগে, যাকে অনুভব করা সম্ভব নয় আবার তাকে এড়িয়ে চলতে পারা সর্বকাঠিন্যভরা অসহায় রকমে অসম্ভব। জাগে যখন তিনি লিখেন-
” আজকাল কবিমাত্রে অনায়াসে জঙ্ঘা বলে যাকে

শব্দের প্রকৃত বোধ কুয়াশায় একা পড়ে থাকে “

কি নির্দ্বিধায় আত্মবিশ্বাসী সে সংজ্ঞায়ন –
” মত কাকে বলে, শোনো । মত তাহাই যা আমার মত,
সেও যদি সায় দেয় সেই মতে তবেই সে মহৎ “

বিশ্বায়নের টালমাটালে বাতাসে গণতন্ত্র তো আমার কথা, আমার সরকার, আমার রাষ্ট্র। সবকিছু আমার। তবেই সব ঠিকঠাক। নয়তো সব বেশুমার ধুন্দুমার ভুল। ভুল আর ভুল- যেন কভু কোনকালে ফোটেনি কোন ফুল। এরপরে আরো স্পষ্টভাষ্যে লিখলেন – ‘ন্যায় অন্যায় জানিনে’ কবিতাটি

“ন্যায় অন্যায় জানিনে
তিন রাউন্ড গুলি খেয়ে তেইশ জন মরে যায়, লোকে এত বজ্জাত হয়েছে !
স্কুলের যে ছেলেগুলো চৌকাটেই ধ্বসে গেলো, অবশ্যই তারা ছিল
সমাজবিরোধী।
ও দিকে তাকিয়ে দ্যাখো ধোয়া তুলসিপাতা
উল্টেও পারেনা খেতে ভাজা মাছটি আহা অসহায়
আত্মরক্ষা ছাড়া আর কিছু জানেনা বুলেটরা।
দার্শনিক চোখ শুধু আকাশের তারা বটে দ্যাখে মাঝে মাঝে।
পুলিশ কখনও কোনও অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ।”

কি অবলীলায় শঙ্খ কত দুর্দান্ত। কবিতার লাইন কতটা প্রতিবাদী হতে পারে মাত্র সে ক’টি লাইনেই তা দেখিয়ে দিলেন –
‘তিন রাউন্ড গুলিতে তেইশ জনের মৃত্যু। ‘
অথবা
‘পুলিশ কখনও কোনও অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ‘ – এর থেকে বড় চপেটাঘাত আর কি হতে পারে!

আগামী পর্বে সমাপ্য…

অচিনপুর ডেস্ক/ জেড. কে. নিপা

Post navigation